রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই এবার তৃণমূল কংগ্রেসের আর্থিক তহবিল নিয়ে উঠল নতুন প্রশ্ন। দল ভাঙনের আবহে ‘নতুন’ তৃণমূলের নেতৃত্ব দাবি করেছে, দলের আর্থিক লেনদেন এবং বিপুল অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। সেই কারণেই একটি স্বাধীন স্পেশাল অডিটর নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার রাতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দলের তহবিলের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। তাঁর দাবি, দলের একাধিক বিধায়ক ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং সর্বসম্মতিক্রমে বিশেষ নিরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঋতব্রতের বক্তব্য, যদি আর্থিক অনিয়ম বা কোনও ধরনের বেনিয়ম থেকে থাকে, তবে তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি জানান, শুধু দলের অভ্যন্তরীণ পর্যায়েই নয়, প্রশাসনের কাছেও এ বিষয়ে পদক্ষেপের আবেদন জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে মূলত তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টকে কেন্দ্র করে। জানা গিয়েছে, ওই তিনটি অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা রয়েছে। ‘ঋতপন্থী’ ১০ জন তৃণমূল বিধায়কের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে রাজ্য পুলিশের সাইবার সেলের তরফে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তার পরই অ্যাকাউন্টগুলিতে আপাতত কোনও ধরনের আর্থিক লেনদেন বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই বিপুল অঙ্কের অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিদ্রোহী শিবিরের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, তহবিলের পরিচালনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদিও কালীঘাট শিবিরের তরফে এ বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই অর্থের মধ্যে কোনও অনিয়মের টাকা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র পথ।
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে নজিরবিহীন ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই দলের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছিল। তার জেরে একের পর এক বিধায়ক, জনপ্রতিনিধি এবং নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিয়েছেন।
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, ইতিমধ্যেই ৬৪ জনের বেশি বিধায়ক কালীঘাটের নেতৃত্ব থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে পরিষদীয় দলের উপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার বিকেলে ‘আসল’ বা ‘নতুন’ তৃণমূলের পক্ষ থেকে নতুন সাংগঠনিক কমিটিও ঘোষণা করা হয়েছে। সেই কমিটি গঠনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দলের আর্থিক তহবিল নিয়ে স্পেশাল অডিটরের দাবি সামনে আসে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও এখন দুই শিবিরের মধ্যে টানাপোড়েন তীব্র আকার নিচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের তহবিলের স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কারণেই ৪৪০ কোটির তহবিল নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবং স্পেশাল অডিটের দাবি আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এখন নজর, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই দাবি নিয়ে কী পদক্ষেপ করে এবং দলের আর্থিক তহবিল সংক্রান্ত এই বিতর্ক কোন দিকে গড়ায়।



