পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরও এক তাৎপর্যপূর্ণ মোড়। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিলেন দলের বর্ষীয়ান নেতা এবং প্রাক্তন মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া। নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই দলীয় নেতৃত্বের প্রতি তাঁর অসন্তোষ ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছিল। সেই অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত দলত্যাগের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।
শনিবার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে মানস ভুঁইয়া জানান, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আদর্শ, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের আর মিল খুঁজে পাচ্ছেন না। সেই কারণেই তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দলনেত্রীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র ইতিমধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মানস ভুঁইয়ার এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তির কাছে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূলের অন্দরে একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দলীয় সংগঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে মানস ভুঁইয়ার পদত্যাগ নিঃসন্দেহে তৃণমূলের জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগেই দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের সময় নিজের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। তাঁর বক্তব্য ছিল, পরিবর্তনের আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সেই অবদানের স্বীকৃতি কখনও পাননি। তাঁর এই মন্তব্য সেই সময়ই রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করেছিল।
এছাড়াও বিরোধী শিবিরের কয়েকজন নেতার প্রশংসা করতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে। সেই থেকেই জল্পনা শুরু হয়েছিল, ভবিষ্যতে তিনি কি অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে চলেছেন? যদিও শনিবার সমস্ত জল্পনায় আপাতত জল ঢেলে দিয়েছেন মানস ভুঁইয়া। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন না, আবার এই মুহূর্তে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দেওয়ার বিষয়েও ভাবছেন না।
তাঁর কথায়, মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল উদ্দেশ্য। জনসেবা থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিতে চান না। ভবিষ্যতে কী করবেন, তা সময়ের সঙ্গে ঠিক করবেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে আপাতত রাজনৈতিকভাবে নিজেকে নতুনভাবে ভাবার সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন প্রবীণ এই নেতা।
রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পর্বে নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী মানস ভুঁইয়া। একসময় কংগ্রেসের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে রাজ্যের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে তিনি দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে রাজ্যসভায় সাংসদ হওয়ার সুযোগ পান। মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে সবং কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন মানস ভুঁইয়া। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। তিনি তৃণমূলে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে উঠে আসেন। পরবর্তীকালে রাজ্যের মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পান তিনি।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের জয়ী হয়ে মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পান মানস ভুঁইয়া। তবে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর দলের কার্যক্রম এবং নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে যে অসন্তোষ তিনি প্রকাশ করেছিলেন, তা ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মানস ভুঁইয়ার পদত্যাগ শুধুমাত্র একজন নেতার দলত্যাগ নয়, বরং এটি তৃণমূলের বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের অন্দরে যে আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে, এই ঘটনা সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিল।
এখন নজর থাকবে মানস ভুঁইয়ার আগামী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে। তিনি আপাতত কোনও নতুন রাজনৈতিক গন্তব্যের কথা না বললেও, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং জনসংযোগের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনীতিতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন বলেই মনে করছেন অনেকেই। ফলে তাঁর এই পদত্যাগ শুধুমাত্র একটি সাংগঠনিক ঘটনা নয়, বরং আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।



