রাজ্য রাজনীতিতে যখন তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নিয়ে একের পর এক আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় দলের অন্যতম প্রবীণ নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের পদত্যাগ নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত জ্যোতিপ্রিয় এবার দলীয় সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ঘটনার তাৎপর্য আরও বেড়েছে এই কারণে যে, গত শনিবারই তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। দলীয় সূত্রের দাবি, নেতৃত্বের আস্থা ও গুরুত্বের প্রতীক হিসেবেই তাঁকে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর এই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন জ্যোতিপ্রিয়। দলের সংগঠন গড়ে তোলা থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়— সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন মমতার অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী। উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতিতে তাঁর নিজস্ব প্রভাব এবং সংগঠনের উপর দখল তাঁকে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে জায়গা করে দিয়েছিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। রাজ্য মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। খাদ্য ও বন দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নানা পর্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতি আস্থা রেখেছেন বলেই দলের অন্দরে জ্যোতিপ্রিয়কে ‘দিদির প্রিয়’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।
তবে গত কয়েক বছরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নানা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। রেশন দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলবন্দি হওয়ার পর বিরোধীরা তাঁকে নিয়ে সরব হয়েছিল। সেই কঠিন সময়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়ান। একাধিক সভা থেকে তিনি দাবি করেছিলেন, জ্যোতিপ্রিয়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে।
এমনকি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বেও মমতা তাঁকে নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। হাবড়ার একটি জনসভায় তিনি বলেছিলেন, তাঁর মন্ত্রিসভায় জ্যোতিপ্রিয় অন্যতম দক্ষ মন্ত্রী ছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগের আবহ সত্ত্বেও তাঁকে নির্বাচনে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল নেতৃত্ব। যদিও সেই নির্বাচনে জয় পাননি জ্যোতিপ্রিয়।
ভোটে পরাজয়ের পর থেকেই তিনি কিছুটা রাজনৈতিকভাবে আড়ালে চলে যান। দলীয় কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি কমে যায় এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁকে খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না। তবে নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, এমন কোনও ইঙ্গিত তখন পর্যন্ত সামনে আসেনি।
বরং জাতীয় কর্মসমিতিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছেই এই বার্তা দিয়েছিল যে, কঠিন সময়ে দলের পাশে থাকা নেতাদের প্রতি এখনও আস্থা রাখছে তৃণমূল নেতৃত্ব। কিন্তু সেই পদ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত অনেককেই বিস্মিত করেছে।
জ্যোতিপ্রিয় অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পিছনে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও শারীরিক কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে গিয়েছে এবং কিডনির সমস্যাও দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সক্রিয়ভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলেই তিনি সমস্ত পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রাক্তন মন্ত্রীর কথায়, তাঁর শারীরিক অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে দলের কাজে সময় ও শক্তি দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে তিনি আর নেই। তাই দায়িত্বে থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারার চেয়ে পদত্যাগ করাই তিনি শ্রেয় মনে করেছেন।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই জ্যোতিপ্রিয়ের এই পদত্যাগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ভোটে প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ ফল, নেতৃত্বে একাধিক রদবদল এবং সংগঠনের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া— সব মিলিয়ে দলের মধ্যে চাপা অসন্তোষ রয়েছে বলেই তাঁদের ধারণা।
বিরোধী শিবিরের দাবি, রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝেই জ্যোতিপ্রিয় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও তৃণমূলের তরফে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
অন্যদিকে, তৃণমূলের একাংশের মতে, জ্যোতিপ্রিয়ের মতো অভিজ্ঞ নেতা শারীরিক সমস্যার কারণে বিশ্রাম নিতে চাইতেই পারেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে অন্য রাজনৈতিক অর্থে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং নানা শারীরিক জটিলতার পরে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পদত্যাগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য নিঃসন্দেহে একটি প্রতীকী ধাক্কা। কারণ দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের যে কয়েকজন নেতার উপর তিনি দীর্ঘদিন নির্ভর করেছেন, জ্যোতিপ্রিয় তাঁদের অন্যতম। তাঁর সরে যাওয়া তৃণমূলের পুরনো নেতৃত্বের একটি অধ্যায়েরও প্রতীকী অবসান বলে মনে করছেন অনেকেই।
আগামী দিনে জ্যোতিপ্রিয় সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাবেন, নাকি শুধুমাত্র সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর পদত্যাগের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সন্ধানে ব্যস্ত। ফলে এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক অভিঘাত আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।



