তারাতলার ভয়াবহ গুদাম ধসের ঘটনায় এবার প্রশাসনিক অনুমোদন এবং নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত গুদামের নকশা বা বিল্ডিং প্ল্যানে কলকাতা পুরসভার অনুমোদন ছিল। সেই অনুমোদনপত্রে তৎকালীন কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারদের সই রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বলেন, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি ওই গুদামের প্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছিল। অনুমোদনের নথিতে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুর শেখ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নির্মলেন্দু সরকার এবং কার্যনির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার রঞ্জন দাসের সই রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি প্রাক্তন মেয়রের স্বাক্ষরের কথাও উল্লেখ করেন।
ঘটনার তদন্তে কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা আধিকারিককে ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পিছনে যাঁদের গাফিলতি থাকবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি না করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।
তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর থেকেই উদ্ধার অভিযান চলছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আহতদের চিকিৎসা এবং উদ্ধারকাজে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ, কলকাতা পুলিশ এবং অন্যান্য সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামের অভাব সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, কলকাতা পুরসভার কাছে পর্যাপ্ত অত্যাধুনিক উদ্ধারকারী যন্ত্র না থাকায় সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর বিহার রেজিমেন্টের সদস্যরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি এনডিআরএফ, সিভিল ডিফেন্স এবং পুলিশ কর্মীদেরও তিনি ধন্যবাদ জানান।
এদিকে, কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও বিধানসভায় প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, পুরসভার বিভিন্ন নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, পুরসভার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ‘কালী’ নামে এক ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে। তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য সামনে আসতে পারে। এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই এফআইআর করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তারাতলা বিপর্যয়ের ঘটনায় ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন গুদামের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি, শ্রমিক সরবরাহকারী এবং নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে যুক্ত লোকজন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, গুদাম নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না, নিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনও গাফিলতি হয়েছিল কিনা।
বিশেষ তদন্তকারী দল ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। সিটের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করছেন। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে আরও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনের তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তারাতলার দুর্ঘটনা ফের একবার শহরের নির্মাণ নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পাশাপাশি এখন নজর রয়েছে তদন্তের ফলাফলের দিকে। কার গাফিলতিতে এই বিপর্যয় ঘটল, তা খুঁজে বের করাই তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য।



