তারাতলার গুদাম বিপর্যয়ের ঘটনায় রাতারাতি সক্রিয় হল কলকাতা পুলিশ। দুর্ঘটনার পরই তদন্তে নেমে গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহরাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার গভীর রাতে তারাতলা এলাকার একটি আবাসন থেকে তাঁকে আটক করেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার পর থেকেই তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। অবশেষে তাঁকে গ্রেপ্তার করে লালবাজার।
এই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের পর পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে। তদন্তের শুরুতেই গুদামের মালিকের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করা হয়। দুর্ঘটনার পিছনে গাফিলতি বা নিয়মভঙ্গের কোনও বিষয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
শুধু গুদামের মালিকই নন, এই ঘটনায় আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অয়ন ট্রেডার্সের সুপারভাইজার গুলজার হুসেন এবং শ্রমিক সরবরাহকারী দিবাকর ভাণ্ডারি। এছাড়াও আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। এরপরই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হয়। দুর্ঘটনার সময় গুদামে কতজন শ্রমিক ছিলেন, তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন ছিল এবং গুদাম পরিচালনায় কোনও নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি এই দল ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছে। সিটে রয়েছেন গোয়েন্দা বিভাগের এসিপি জয়সূর্য মুখোপাধ্যায়, হোমিসাইড বিভাগের আধিকারিক দেবাশিস দত্ত, গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর হিরক দলপতি, গুণ্ডাদমন শাখার ইন্সপেক্টর সরফরাজ আহমেদ এবং তারাতলা থানার আধিকারিকরা।
বৃহস্পতিবার সিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করবেন বলে জানা গিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের অবস্থা, গুদামের কাঠামোগত পরিস্থিতি এবং দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হবে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, শুধুমাত্র গুদামের মালিক বা শ্রমিক নিয়োগকারীর ভূমিকা নয়, ঘটনার সঙ্গে আর কেউ যুক্ত ছিলেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেই কারণে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালেও ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের উদ্ধারকারী দল একসঙ্গে কাজ করছে। ধসে যাওয়া গুদামের চারপাশে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে লোহার বিম, সিমেন্টের চাঙড় এবং ধ্বংসাবশেষ। উদ্ধারকারীরা ধাপে ধাপে সেগুলি সরিয়ে ভিতরে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খুঁজে দেখছেন।
উদ্ধারকারী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে। ভিতরে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে রয়েছেন কি না, নিশ্চিত হওয়ার পরই উদ্ধারকাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বুধবার রাতভর ঘটনাস্থলে থেকে পরিস্থিতির তদারকি করেন মন্ত্রী তথা স্থানীয় বিধায়ক ইন্দ্রনীল খাঁ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাও। উদ্ধারকাজের অগ্রগতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং শিল্প ও গুদাম ব্যবস্থাপনার নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এখন পুলিশের সামনে মূল লক্ষ্য হল দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা, দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না তা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।



