তারাতলার ভয়াবহ গুদাম বিপর্যয়ের ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দুর্ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দিতে গিয়ে তিনি জানান, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই দুর্ঘটনায় মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে রয়েছে। আহতদের উদ্দেশেও তিনি আশ্বাস দেন যে, তাঁদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় কোনও খামতি রাখা হবে না।
তারাতলা গুদাম ধসের পর উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত তথ্যও বিধানসভায় তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, দুর্ঘটনার মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই উদ্ধারকাজ শুরু হয়ে যায়। প্রথমে কলকাতা পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার কাজে হাত লাগান। পরে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরাও অভিযানে যোগ দেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বুধবার রাতভর উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার সকালেও তা অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ চালাচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালেও কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত মোট ২৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকিরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রশাসনের তৎপরতা নিয়েও বিধানসভায় বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রথম থেকেই প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা নজরদারি চালিয়েছেন। ঘটনাস্থলে ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়-সহ একাধিক মন্ত্রী পৌঁছেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনার পরপরই তিনি পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে গেলে উদ্ধার কাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে তিনি কিছুটা পরে সেখানে যান। পরে হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন এবং চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ নেন।
এদিকে, তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তে ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি এই দল দুর্ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য হল, গুদাম ধসের প্রকৃত কারণ এবং এর পিছনে কারও গাফিলতি ছিল কি না তা চিহ্নিত করা।
সিটে রয়েছেন গোয়েন্দা বিভাগের এসিপি জয়সূর্য মুখোপাধ্যায়, হোমিসাইড বিভাগের অফিসার ইনচার্জ দেবাশিস দত্ত, গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর হিরক দলপতি, গুণ্ডাদমন শাখার ইন্সপেক্টর সরফরাজ আহমেদ এবং তারাতলা থানার আধিকারিকরা।
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন অয়ন ট্রেডার্সের সুপারভাইজার গুলজার হোসেন, লোহার কাঠামো প্রস্তুতকারক কমল সামন্ত, জমি লিজ নেওয়া শম্ভুনাথ বেহেরা, শ্রমিক সরবরাহকারী ও ট্রাইমেক্স ঠিকাদার দিবাকর ভাণ্ডারি এবং কেএমসির নির্মাণ পরিকল্পনা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা আবদুল হামিদ।
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্ঘটনার আগে এবং পরে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, শুধুমাত্র ধৃত পাঁচজনেরই কোনও ভূমিকা ছিল কি না, নাকি আরও কেউ এই ঘটনায় যুক্ত রয়েছেন।
প্রয়োজনে তদন্তের স্বার্থে আরও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে এবং গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, ঘটনাস্থলে এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে বিশাল লোহার বিম, সিমেন্টের চাঙড় এবং ভেঙে পড়া কাঠামোর অংশ। উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি অংশ সরিয়ে দেখছেন, যাতে কোনও আটকে থাকা ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তারাতলার এই দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন নজর রয়েছে উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়া এবং তদন্তের পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সামনে আসার দিকে।



