রাজ্যের সাম্প্রতিকতম শিল্পাঞ্চল-সংলগ্ন দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধস। গত ২৪ জুন দুপুরে হঠাৎ ভেঙে পড়ে বহুতল কাঠামোটি। সেই সময় ভেতরে নির্মাণকাজ চলায় বহু শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং সেনা। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর বহু শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হলেও সরকারি হিসাবে প্রাণ হারান ১৬ জন।
মঙ্গলবার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে সরকারি আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়। নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারের হাতে দেওয়া হয়েছে ১০ লক্ষ টাকা করে, আর আহতদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১ লক্ষ টাকা করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ নিয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানে এক মৃত শ্রমিকের স্ত্রী পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে চাকরির আবেদন জানান। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতেই মুখ্যমন্ত্রী জানান, নিহতদের পরিবারের যোগ্য সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করবে রাজ্য সরকার। তিনি বলেন, কলকাতা পুর প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে এবং পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা আবেদনকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও উপযুক্ত শূন্যপদ বিবেচনা করে সম্ভাব্য নিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে পুরসভায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আগামী সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর আবেদনগুলি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, চাকরির ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নেও নতুন আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নিহতদের পরিবারকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত না হলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্বও রাজ্য সরকার বহন করবে। আহতরা সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা বিনামূল্যে দেওয়া হবে। এই বিষয়ে অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী।
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশ্বাস দিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, যেসব পরিবার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে, তাদের সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্বও রাজ্য সরকার গ্রহণ করবে। যাতে আর্থিক অনটনের কারণে কোনও শিশুর পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক পরিবারের সদস্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। কেউ চাকরির আবেদন করেন, কেউ আবার চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শোনার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে দ্রুত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী।
তারাতলার এই দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে সেনা, এনডিআরএফ, দমকল ও পুলিশ যৌথভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়েছিল। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে দিনরাত এক করে কাজ করেন উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্যরা। সেই অভিযানে বহু শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও প্রাণহানির সংখ্যা রাজ্যজুড়ে গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি করে।
রাজ্য সরকারের দাবি, দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলিকে শুধু এককালীন ক্ষতিপূরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার আওতায় আনার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সম্ভাব্য মাসিক আর্থিক সহায়তার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
এদিকে, দুর্ঘটনার কারণ ও নির্মাণ সংক্রান্ত সম্ভাব্য গাফিলতি নিয়েও তদন্ত চলছে। প্রশাসনের একাংশের দাবি, তদন্ত শেষ হলে দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্মাণস্থলে নিরাপত্তা বিধি আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।



