সিংহস্থের প্রস্তুতিতে রাস্তা চওড়া করার উদ্যোগ
উজ্জয়িনী ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ মেলার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর যাতায়াতের কথা মাথায় রেখে শহরের পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে।
তারই অংশ হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা চওড়া করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে শহরের নির্দিষ্ট অংশে রাস্তার প্রস্থ বাড়িয়ে যানবাহন ও পুণ্যার্থীদের চলাচল সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে Ujjain Municipal Corporation।
এই প্রকল্পের আওতায় মোট ২৭২টি নির্মাণকে অপসারণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বাড়ি ও অন্যান্য নির্মাণের পাশাপাশি শাহি মসজিদের একটি অংশও পড়েছে।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাস্তার প্রস্থ ১৫ মিটার পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। মসজিদের যে অংশটি প্রস্তাবিত রাস্তার অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে পড়ছে, মূলত সেই অংশ নিয়েই বর্তমান বিরোধ।
পুরো মসজিদ নয়, সরানো হবে নির্দিষ্ট অংশ
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ‘মসজিদ ভেঙে ফেলা’ নিয়ে নানা দাবি ছড়ালেও প্রশাসনিক পদক্ষেপটি পুরো শাহি মসজিদ ভেঙে ফেলার নয়।
রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য মসজিদের নির্দিষ্ট একটি অংশ সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রার্থনাকক্ষের একটি অংশ এবং মিনারের একটি অংশ এই অপসারণের আওতায় থাকার কথা বলা হয়েছে।
মসজিদ পরিচালনাকারী পক্ষ অবশ্য এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এটি একটি ধর্মীয় স্থাপনা এবং ওয়াকফ সম্পত্তি হওয়ায় বিশেষ সুরক্ষা বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে প্রশাসনের যুক্তি ছিল, রাস্তা সম্প্রসারণের বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রকল্পে ধর্মীয় স্থাপনাকে আলাদা সুবিধা দেওয়া যায় না।
হাই কোর্টে মামলা, খারিজ হল আবেদন
মসজিদের অংশ অপসারণের বিরুদ্ধে শাহি মসজিদ ওয়াকফ পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টে মামলা করা হয়।
ইন্দোর বেঞ্চের বিচারপতি সন্দীপ এন. ভট্টের নেতৃত্বাধীন একক বেঞ্চ ৯ সেপ্টেম্বর দুইটি সংযুক্ত রিট পিটিশন খারিজ করে দেয়। আদালতের রায়ে রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য মসজিদের অংশ অপসারণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হয়নি।
আদালতের পর্যবেক্ষণে রাস্তা সম্প্রসারণের প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মসজিদকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার দাবির বিষয়টিও উঠে আসে। ফলে আদালতের রায়ের পর প্রশাসনের সামনে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার আইনি বাধা আর থাকেনি।
এই রায়ের পরই সোমবার মসজিদের নির্দিষ্ট অংশ সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নেয় প্রশাসন।
রাতভর মসজিদ চত্বরে জড়ো হন স্থানীয়রা
প্রশাসনের পদক্ষেপের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রবিবার রাত থেকেই শাহি মসজিদ চত্বরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষ জড়ো হন।
কয়েকজন সেখানে রাতভর অবস্থান করেন এবং মসজিদের অংশ অপসারণ বন্ধ রাখার দাবি জানান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ে টানাপোড়েন চলতে থাকে।
সোমবার সকালে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মসজিদ কমিটির সঙ্গে আলোচনার পর নির্দিষ্ট অংশ সরানোর বিষয়ে সমঝোতার পথ তৈরি হয়। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ নিজেরাই রাস্তার কাজে বাধা দেওয়া অংশ সরানোর উদ্যোগ নিতে রাজি হন বলেও রিপোর্ট রয়েছে।
তবে এর পরেও ঘটনাস্থলে উত্তেজনা সম্পূর্ণ কাটেনি।
পাথর ছোড়ার অভিযোগ, কাঁদানে গ্যাস পুলিশের
সোমবার সকালে প্রশাসন কাজ শুরু করতে গেলে ঘটনাস্থলে ফের বিক্ষোভ শুরু হয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার অভিযোগ ওঠে।
এর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিভিন্ন ভিডিও ও সংবাদ প্রতিবেদনে পুলিশকে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। লাঠিচার্জের ঘটনাও একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে Rapid Action Force মোতায়েন করা হয়। মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে ব্যারিকেড দেওয়া হয়।
উত্তেজনার কারণে গোটা এলাকা কার্যত নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়।
বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলেন মহিলারাও
বিক্ষোভে স্থানীয় মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণও নজরে এসেছে। তাঁদের একটি অংশ মসজিদ চত্বরে অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন।
পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে বিক্ষোভকারীদের প্রত্যেকের অবস্থান এক ছিল না। কিছু স্থানীয় মুসলিম প্রতিনিধি রাস্তা সম্প্রসারণের কাজে সহযোগিতা করার পক্ষে থাকলেও অন্য একটি অংশ মসজিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের কথা তুলে ধরে আপত্তি জানায়।
৬০০ বছরের বেশি পুরনো মসজিদ ঘিরে আবেগ
শাহি মসজিদকে স্থানীয়ভাবে একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মসজিদটির বয়স প্রায় ৬৩৬ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মসজিদ পরিচালনাকারী পক্ষ এটিকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।
ফলে রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য এর একটি অংশ সরানোর সিদ্ধান্তকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা নগর পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়দের একাংশ।
অন্যদিকে প্রশাসনের যুক্তি হল, সিংহস্থের মতো বিশাল ধর্মীয় সমাবেশের সময় বিপুল মানুষের চলাচল সামলাতে শহরের রাস্তা ও পরিকাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন।
এই দুই অবস্থানের সংঘাত থেকেই মূলত বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িও পড়েছে প্রকল্পের আওতায়
উজ্জয়িনীর রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্পে শুধু শাহি মসজিদ নয়, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের পৈতৃক বাড়ির সামনের অংশও পড়েছে।
রবিবার মুখ্যমন্ত্রী নিজেই তাঁর পুরনো বাড়ির একটি অংশ ভাঙার কাজে অংশ নেন। প্রায় ২.৯ মিটার সামনের অংশ রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য সরানো হয়েছে বলে India Today জানিয়েছে। তাঁর বাড়িও মোট ২৭২টি নির্মাণের তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উদাহরণ তুলে ধরে বলা হচ্ছে, রাস্তা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কোনও একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থাপনাকে আলাদা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
তবে শাহি মসজিদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক চরিত্রের কারণে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তা আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। কংগ্রেস সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়ি রাস্তা সম্প্রসারণের বিকল্প পরিকল্পনার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে রাজ্য প্রশাসনের বক্তব্য, সিংহস্থ মেলার আগে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং পুণ্যার্থীদের যাতায়াত সহজ করাই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। আদালত ইতিমধ্যেই মসজিদের অংশ অপসারণের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আবেদন খারিজ করেছে। ফলে এখন মূল প্রশ্ন প্রশাসন কীভাবে কাজটি সম্পন্ন করে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে পরিস্থিতি কীভাবে সামলায়।
সামনে কী?
সোমবারের উত্তেজনার পর উজ্জয়িনী প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
একদিকে ২০২৮ সালের সিংহস্থের আগে দ্রুত পরিকাঠামো তৈরির চাপ রয়েছে, অন্যদিকে ধর্মীয় স্থাপনা সংক্রান্ত সংবেদনশীলতার কারণে স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করাও জরুরি।
মসজিদের যে অংশ রাস্তার অ্যালাইনমেন্টে পড়েছে, সেটি কতটা এবং কীভাবে সরানো হবে, কাজের পরবর্তী ধাপ কী হবে এবং বিক্ষোভের ঘটনায় পুলিশ কোনও মামলা বা গ্রেপ্তার করে কি না—এসবের উপর এখন নজর রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সিংহস্থের প্রস্তুতিতে উজ্জয়িনীর রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্প সোমবার নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ২৭২টি নির্মাণের তালিকায় থাকা শাহি মসজিদের একটি অংশ সরানোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিক্ষোভ, পাথর ছোড়ার অভিযোগ, কাঁদানে গ্যাস এবং RAF মোতায়েন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। আদালত ইতিমধ্যেই প্রশাসনের পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এখন নজর, শান্তিপূর্ণভাবে বাকি কাজ শেষ করা যায় কি না এবং এই ঘটনায় পরবর্তী কোনও আইনি পদক্ষেপ হয় কি না।



