পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত সই জালিয়াতি মামলার তদন্ত ক্রমশ জটিল আকার নিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই মামলাকে ঘিরে একাধিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেলেও রবিবারের জিজ্ঞাসাবাদে নতুন মোড় এসেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
তদন্তের অংশ হিসেবে দ্বিতীয়বারের জন্য ভবানী ভবনে হাজির হন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সকাল থেকেই সিআইডি দপ্তরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা ধরে তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন তদন্তকারীরা।
সূত্রের খবর, মামলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয় অভিষেকের কাছে। তদন্তকারীরা জানতে চান, সংশ্লিষ্ট নথি, সই এবং দলীয় সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি কতটা অবগত ছিলেন এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না।
এদিকে একই দিনে তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষকেও ডেকে পাঠানো হয়। প্রথমে দুই নেতাকে পৃথকভাবে জেরা করা হয়। পরে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের মুখোমুখি বসিয়ে একই বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হয়।
সিআইডি সূত্রে দাবি, পৃথক জেরায় কিছু প্রশ্নের যে উত্তর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছিলেন, মুখোমুখি জেরার সময় সেই বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী উত্তরের মিল পাওয়া যায়নি। কয়েকটি বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে বলেও তদন্তকারীদের দাবি। সেই অসঙ্গতিগুলি নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে তদন্তকারী মহলের একাংশের অভিমত।
এই পরিস্থিতিতে তদন্তকারীরা মনে করছেন, এখনও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়। তাই মামলার পূর্ণ চিত্র সামনে আনতে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী দিনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবারও তলব করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
এই মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নতুন নয়। এর আগেও তাঁকে একাধিকবার তলব করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তিনি নির্ধারিত দিনে হাজিরা দেননি। পরে আদালতের পর্যবেক্ষণের পর তদন্তে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যদিও আদালতের কিছু শর্ত ও আইনি সুরক্ষা নিয়েই ভবানী ভবনে উপস্থিত হন তৃণমূল সাংসদ।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম দফার জেরাতেও অনেক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়েছিলেন অভিষেক। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তিনি নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। দ্বিতীয় দফার জেরায় সেই উত্তরগুলির সত্যতা এবং ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মামলার তদন্ত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রত্যেকটি বক্তব্য এবং নথিপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে মুখোমুখি জেরায় পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতের তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে আইনি চ্যালেঞ্জও ক্রমশ বাড়ছে। সোমবার তাঁকে নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় ইডির সামনে হাজিরা দিতে হয়েছে। আবার মঙ্গলবার ডিজে মন্তব্য সংক্রান্ত মামলায়ও সিআইডির সামনে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে তাঁর।
শুধু এই দুটি মামলাই নয়, বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত এবং অভিযোগ ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কয়লা পাচার মামলায় দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আমফানের ত্রাণ বিতরণে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পৃথক থানায় অভিযোগও দায়ের হয়েছে।
ফলে একের পর এক আইনি এবং রাজনৈতিক চাপে তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতাকে আগামী কয়েকদিন ব্যস্ত সময় কাটাতে হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল বারবার দাবি করে এসেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তাঁকে নানা মামলায় জড়ানো হচ্ছে এবং তদন্তের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে।
এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপে। সিআইডি আদৌ নতুন করে তলব পাঠায় কি না এবং মুখোমুখি জেরায় উঠে আসা অসঙ্গতিগুলি শেষ পর্যন্ত মামলার গতিপথে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্য রাজনীতি।



