তোলাবাজি সংক্রান্ত মামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক নতুন তথ্য। এবার তদন্তকারীদের নজরে এসেছে নদিয়ার করিমপুরের একটি বাড়ি, যেখানে রাতভর তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। এই অভিযানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে রাজারহাট-নিউটাউনের প্রাক্তন বিধায়ক সব্যসাচী দত্তকে, যিনি বর্তমানে তোলাবাজির মামলায় গ্রেফতার অবস্থায় রয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার গভীর রাতে বিধাননগর উত্তর থানার একটি বিশেষ দল নদিয়ার করিমপুরে পৌঁছয়। স্থানীয় থানার পুলিশও অভিযানে সহযোগিতা করে। কিশোরপুর এলাকার একটি বাড়িকে ঘিরে শুরু হয় দীর্ঘ তল্লাশি। ওই বাড়িটি তৃণমূল নেত্রী এবং নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্য টিনা ভৌমিক সাহার পৈতৃক বাসভবন বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযান চালানো হয়। রাত প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ পুলিশ সেখানে পৌঁছয়। পরে প্রাক্তন বিধায়ক সব্যসাচী দত্তকে একটি গাড়িতে করে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সূত্রের খবর, অভিযানে সাত জন পুলিশ আধিকারিক এবং দুই ডজনের কাছাকাছি পুলিশকর্মী অংশ নেন। নিরাপত্তার স্বার্থে গোটা এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল।
দীর্ঘ তল্লাশির পর বাড়ির ভিতর থেকে প্রায় তিন কেজি সোনার গয়না উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ওই সোনার মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকার কাছাকাছি বলে প্রাথমিক হিসাব। উদ্ধার হওয়া গয়নাগুলির প্রকৃতি, কেনার সময়কাল এবং মালিকানা সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের অনুমান, তোলাবাজি সংক্রান্ত মামলার আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে এই সোনার যোগ থাকতে পারে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি। তদন্তকারীরা এখন জানতে চাইছেন, বিপুল পরিমাণ সোনা কীভাবে ওই বাড়িতে এল এবং তা কার দখলে ছিল।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুন তোলাবাজির অভিযোগে সব্যসাচী দত্তকে গ্রেফতার করেছিল বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ। গ্রেফতারের পর থেকেই তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এর আগেও রাজারহাটে তাঁর আবাসন এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্ক লকারে তল্লাশি চালিয়ে কয়েক কেজি সোনার সন্ধান পেয়েছিলেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের একটি অংশের দাবি, তদন্তে এমন তথ্য মিলেছে যে, নগদ অর্থকে অন্য সম্পদে রূপান্তর করার উদ্দেশ্যে সোনা কেনা হয়ে থাকতে পারে। সেই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে সোনার উৎস, কেনাবেচার নথি এবং আর্থিক লেনদেনের খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুধু সোনাই নয়, তদন্তের অংশ হিসেবে সব্যসাচী দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী ইন্দ্রানী দত্তের নামে থাকা একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও ফ্রিজ করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট, মেয়াদি আমানত এবং নগদ মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি আপাতত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থের উৎস খুঁজতে বিভিন্ন আর্থিক নথি সংগ্রহের কাজ চলছে।
এদিকে, তল্লাশি চালানো বাড়ির সঙ্গে যুক্ত তৃণমূল নেত্রী টিনা ভৌমিক সাহাকে এর আগেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু তিনি হাজির হননি বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। তার মধ্যেই তাঁর পৈতৃক বাড়িতে এই তল্লাশি এবং সোনা উদ্ধারের ঘটনায় মামলাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়িটির মালিক টিনার বাবা কাঞ্চন ভৌমিক। তিনি এলাকার একটি কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। উদ্ধার হওয়া সোনা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, এগুলি তাঁদের পারিবারিক গয়না। তাঁর কথায়, পরিবারের একাধিক সদস্যের গয়না ওই বাড়িতে রাখা ছিল এবং তার মধ্যে মেয়েরও কিছু গয়না থাকতে পারে।
তবে তদন্তকারীরা এই ব্যাখ্যায় আপাতত সন্তুষ্ট নন। উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণ, তার আর্থিক মূল্য এবং নথিপত্রের যথার্থতা যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আয়কর এবং অন্যান্য আর্থিক সংস্থার সঙ্গেও তথ্য আদানপ্রদান করা হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনার পর রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের দাবি, উদ্ধার হওয়া সম্পদের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। শুধু সোনার গয়না নয়, বিভিন্ন জায়গায় থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাবও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে এখনও পর্যন্ত টিনা ভৌমিক সাহার তরফে এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে উদ্ধার হওয়া সোনার মালিকানা, তার উৎস এবং মামলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগ নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
তদন্তকারী সংস্থার একাংশের মতে, এই মামলার আর্থিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সাম্প্রতিক অভিযানে যে পরিমাণ সম্পদের খোঁজ মিলছে, তাতে গোটা মামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ, নথি পরীক্ষা এবং সম্পত্তির উৎস অনুসন্ধানের মাধ্যমে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলের।



