হাউসে ২৬২-১৫৯ ভোটে পাশ রাশিয়া-সংক্রান্ত বিল
বুধবার মার্কিন সময় অনুযায়ী হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে চূড়ান্ত ভোটাভুটি হয়। ২৬২ জন সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৫৯টি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শুধু রিপাবলিকান সদস্যরাই নন, বেশ কিছু ডেমোক্র্যাট সাংসদও বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
বিলটি ইতিমধ্যেই সেনেটে অনুমোদন পেয়েছে। ফলে দুই কক্ষের আইনসভার প্রক্রিয়া কার্যত শেষ হয়েছে। এখন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর স্বাক্ষরই বাকি। স্বাক্ষরের পরেই প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা ও নতুন tariff authority কার্যকর হওয়ার আইনি পথ খুলবে।
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এখনও কার্যকর হয়নি। আইনটি প্রেসিডেন্টকে এমন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেবে; বাস্তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে কি না এবং কোন দেশকে কী হারে শুল্কের আওতায় আনা হবে, তা পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়।
ভারত-চিনকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি চাপ
বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত tariff আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই তালিকায় ভারত ও চিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশই রুশ অপরিশোধিত তেলের বড় ক্রেতা। ফলে আইন কার্যকর হওয়ার পর Washington যদি tariff authority ব্যবহার করে, ভারতীয় পণ্য মার্কিন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্কের মুখে পড়তে পারে।
তবে শুধু ভারত ও চিন নয়, রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকটি দেশও সম্ভাব্য ভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, Slovakia, Hungary এবং Azerbaijan-এর মতো দেশগুলির ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কী উদ্দেশ্যে এই বিল?
বিলটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্বের উপর চাপ তৈরি করা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার আইনপ্রণেতাদের যুক্তি হল, তৃতীয় দেশগুলি রুশ জ্বালানি কিনতে থাকলে মস্কোর কাছে বৈদেশিক আয় আসতে থাকবে। ফলে রাশিয়ার উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তার বড় ক্রেতাদের উপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা প্রয়োজন।
এই কারণেই বিলটিতে রাশিয়ার energy sector, financial institutions এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত ‘shadow fleet’-এর বিরুদ্ধেও একাধিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
Lindsey Graham-এর নামেই আইন
নতুন বিলটির নাম Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026। প্রয়াত মার্কিন সেনেটর Lindsey Graham দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
আগের পর্যায়ে রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলির উপর আরও বেশি মাত্রায় শুল্ক আরোপের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী আলোচনায় বিলের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ tariff authority-এর রূপ নেয়।
Graham-এর মৃত্যুর পরেও বিলটি নিয়ে মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসে আলোচনা অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত সেনেট এবং হাউস—দুই কক্ষেই এটি অনুমোদন পেল।
কেন ডেমোক্র্যাটদের একাংশ সমর্থন করলেন?
হাউসে বিলটি পাস হওয়ার ক্ষেত্রে দুই দলের সদস্যদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিলটি নিয়ে মতভেদও রয়েছে।
CBS-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে সাত জন রিপাবলিকান এর বিরোধিতা করেছেন।
ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ অবশ্য প্রেসিডেন্টের tariff ক্ষমতা এতটা বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই ধরনের বিস্তৃত ক্ষমতা ব্যবহার করলে মার্কিন অর্থনীতিতেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বিলটিতে এমন কিছু ব্যতিক্রম ও loophole রয়েছে যা এর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ বিলটি দুই দলের সমর্থন পেলেও এর সব ধারার বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসে ঐকমত্য রয়েছে—এমন নয়।
ভারতের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব কী?
ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রুশ তেল আমদানি নিয়ে। গত কয়েক বছরে রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার তেল তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়ার সুযোগ ভারতের পরিশোধন শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে সাহায্য করেছে। সেই কারণে রুশ তেল আমদানি ভারতের জ্বালানি নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এখন যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে বিষয়টি শুধু ভারত-মার্কিন বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতীয় রফতানিকারকদের মার্কিন বাজারে অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়তে হতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতকে রুশ তেল আমদানি কমানোর বিষয়েও নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—তিন ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখনই ১০০% শুল্ক নয়
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হাউসে বিল পাশ হওয়া মানেই ভারতীয় পণ্যের উপর সঙ্গে সঙ্গে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে যাচ্ছে না।
বিলটি প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত tariff আরোপের ক্ষমতা দিচ্ছে। অর্থাৎ এটি একটি ক্ষমতা বা আইনি হাতিয়ার। কোন দেশের উপর সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে, কখন করা হবে এবং বাস্তবে কত শতাংশ tariff আরোপ করা হবে—সেটি পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর’ হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক হবে না।
ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ছে
হাউসের ভোটের পর ভারত ও চিনের উপর সম্ভাব্য tariff নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাপের বার্তাও এসেছে। মার্কিন সেনেটর Richard Blumenthal ভারত ও চিনকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করে অন্য উৎস থেকে জ্বালানি কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই অপরিশোধিত তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলে নতুন মার্কিন আইন কার্যকর হলে নয়াদিল্লির সামনে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই তৈরি হতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নতুন চাপ
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলি মস্কোর উপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
নতুন মার্কিন আইন সেই বাণিজ্যিক ব্যবস্থার উপর আরও চাপ তৈরি করার চেষ্টা। সরাসরি রাশিয়ার সংস্থা বা জ্বালানি খাতের উপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বড় ক্রেতা দেশগুলিকেও সম্ভাব্য tariff-এর মুখে ফেলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আইনটি কার্যকর হওয়ার পর Trump প্রশাসন কীভাবে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে, সেটিই এখন মূল বিষয়। বিশেষ করে ভারত ও চিনের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে Washington কী অবস্থান নেয়, তার উপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, রুশ তেল কেনার দেশগুলির উপর মার্কিন চাপ আরও এক ধাপ বাড়ল। Senate-এর পর House-ও ২৬২-১৫৯ ভোটে বিল অনুমোদন করায় এখন সেটি Trump-এর স্বাক্ষরের অপেক্ষায়। তবে ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এখনও বসেনি। প্রেসিডেন্ট সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তবেই বাস্তবে নতুন tariff-এর প্রভাব পড়বে। ফলে এখন নজর White House-এর পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।



