রবিবার সকালে কলকাতার ঐতিহাসিক Red Road কার্যত পরিণত হয় এক বিশাল যোগমঞ্চে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের ১২তম বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম দেখা যায়। সূর্য ওঠার আগেই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যোগপ্রেমীরা রেড রোডে পৌঁছতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে ছিল বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশেষ আয়োজন, যার মধ্যে ছৌ নৃত্য এবং ঢাকের বাদ্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
এই প্রথম কলকাতায় আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী। মঞ্চে উঠে তিনি বলেন, যোগ এখন আর কেবল একটি ব্যায়াম পদ্ধতি নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী সুস্থতা, সংহতি ও ইতিবাচক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে যোগের চর্চা ছড়িয়ে পড়েছে এবং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক সেতুবন্ধনের কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ২১ জুন এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। যোগের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি সমাজের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পারে। তিনি বলেন, যোগ কেবল অল্পবয়সিদের জন্য নয়; শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের জীবনযাত্রায় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এরপর প্রধানমন্ত্রী সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মাটিতে বসে বিভিন্ন যোগাসন অনুশীলন করেন। প্রায় আধঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই সেশনে তাঁকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে যোগাভ্যাস করতে দেখা যায়। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তিনি মঞ্চ থেকে নেমে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাঁদের অনুশীলনও পর্যবেক্ষণ করেন। কয়েকজনের যোগাসনের ভঙ্গি সংশোধন করে দিতেও দেখা যায় তাঁকে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বারবার যোগের স্বাস্থ্যগত উপকারিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিয়মিত যোগচর্চা মানুষকে দীর্ঘদিন সুস্থ, কর্মক্ষম এবং মানসিকভাবে সজীব রাখতে সাহায্য করে। বয়স বাড়লেও শরীর ও মনের তারুণ্য বজায় রাখতে যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তাঁর কথায়, একজন ব্যক্তি ৫০ কিংবা ৭০ বছর বয়সেও নিজেকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও কর্মক্ষম অনুভব করতে পারেন, যদি তিনি নিয়মিত যোগাভ্যাস করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, যোগ মানসিক চাপ কমাতে, মনোসংযোগ বাড়াতে এবং জীবনে ইতিবাচকতা আনতে সাহায্য করে।
এদিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্যদের সঙ্গে যোগাভ্যাসে অংশ নেন। মঞ্চ থেকে তিনি বলেন, যোগ ভারতের বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ এবং এর মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্থিতিও অর্জন করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে যোগ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস এখন কেবল একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে যোগকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যোগের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন এটি কেবল বছরে একদিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হবে। তিনি দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানান, যোগকে নিজেদের পরিবার ও আগামী প্রজন্মের জীবনের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে United Nations ২১ জুনকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। এ বছরও বিশ্বের বহু দেশে যোগ দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, বিশ্বের ১৯২টিরও বেশি দেশে যোগ দিবস পালিত হচ্ছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন।
কলকাতার রেড রোডে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে ঘিরে উৎসাহ এবং আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন আয়োজকরা। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এদিনের যোগ কার্নিভাল কার্যত এক উৎসবের আবহ তৈরি করে শহরের বুকে।



