বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণের জেরে শুক্রবার সকালেই কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে জল জমে দুর্ভোগের ছবি সামনে আসে। শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, গলি এবং নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ায় অফিসযাত্রী, স্কুলপড়ুয়া এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়। সকাল থেকেই যানবাহনের গতি কমে যায় এবং বহু জায়গায় জল জমে থাকার কারণে যানজটেরও সৃষ্টি হয়।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুক্রবার কলকাতায় দিনভর বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শহরে প্রায় ৯০ শতাংশ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। ফলে দিনের বিভিন্ন সময় মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদরা। আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যায়, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একাধিক আবহাওয়াগত কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। পূর্ব বাংলাদেশের উপর একটি ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি মৌসুমি অক্ষরেখা রাজস্থান থেকে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এই অক্ষরেখা সক্রিয় থাকায় বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করছে। তারই প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কলকাতার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও একই ধরনের আবহাওয়া বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান এবং মুর্শিদাবাদে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি। এসব জেলায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রশাসন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু কলকাতা নয়, দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও দফায় দফায় বজ্রবিদ্যুৎসহ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি চলতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত এই অস্থির আবহাওয়া বজায় থাকতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকা এবং জল জমার প্রবণতা রয়েছে এমন জায়গাগুলিতে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্ষার এই দাপটের প্রভাব পড়েছে উপকূলবর্তী এলাকাতেও। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার এবং শনিবার বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা ইতিমধ্যেই গভীর সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, নিম্নচাপ না থাকলেও ঘূর্ণাবর্ত এবং সক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখার যৌথ প্রভাবে এই ধরনের প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু ক্রমাগত মেঘ তৈরি করছে, যার ফলে বৃষ্টি থামার কোনও সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আগামী কয়েক দিন একই ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শুক্রবার প্রায় ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকবে, ফলে অস্বস্তিও বজায় থাকবে।
উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টির দাপট কম নয়। আলিপুরদুয়ার জেলায় অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনায় কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এছাড়া দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুরে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় হলুদ সতর্কতা জারি রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধসের আশঙ্কা এবং নদী-নালার জলস্তর বৃদ্ধির বিষয়েও প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা বর্ষণের ফলে শহর ও জেলার নিচু এলাকাগুলিতে জল জমার সমস্যা আরও বাড়তে পারে। কোথাও কোথাও নিকাশি ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সেই কারণে পুরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনকে জল নিষ্কাশনের কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় জল জমে থাকায় অফিস টাইমে যান চলাচলে ধীরগতি দেখা যায়। বহু মানুষকে হাঁটুসমান জল পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়েছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে জল নামতে সময় লাগছে। ফলে দিনের দ্বিতীয়ার্ধেও কিছু এলাকায় জল জমে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সোমবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বর্ষণ চলতে পারে। তাই আবহাওয়ার সর্বশেষ আপডেট নিয়মিত নজরে রাখার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সময় খোলা জায়গায় অবস্থান না করা, বড় গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং জল জমা রাস্তায় সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বর্ষার এই সক্রিয় পর্যায় আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকায় কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যেই প্রশাসন সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে।



