রাষ্ট্রপতি ভবনে নতুন দায়িত্ব মেজর নব্যার
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি কাজ করার জন্য নিযুক্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক আধিকারিক হলেন এডিসি বা ‘এইড-দ্য-ক্যাম্প’। এবার সেই দায়িত্বেই দেখা যাচ্ছে মেজর নব্যা শেখাওয়াতকে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ, ২০২৬ সালের জুলাই থেকেই রাষ্ট্রপতি ভবনে এই দায়িত্ব পালন করছেন নব্যা। ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে এই পদে তাঁর নিয়োগকে বিশেষ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও মহিলা সেনা আধিকারিক রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পেলেন।
রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক কর্মসূচি, সামরিক ও সরকারি প্রটোকল এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে এডিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রেখে কাজ করতে হয় এই আধিকারিককে। ফলে এই দায়িত্বের জন্য পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, সংগঠনের ক্ষমতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
রাজস্থানের গ্রাম থেকে সেনাবাহিনীতে
মেজর নব্যা শেখাওয়াতের শিকড় রাজস্থানে। তিনি সিকার জেলার কেরপুরা গ্রামের বাসিন্দা। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।
কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিসেস বা CDS পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন নব্যা। সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে ২০২১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আর্মি সার্ভিস কর্পসে কমিশন পান।
আর্মি সার্ভিস কর্পস বা ASC সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শান্তিকালীন মোতায়েন—সব ক্ষেত্রেই সেনার বিভিন্ন ইউনিটের প্রয়োজনীয় রসদ ও সহায়ক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই শাখার ভূমিকা রয়েছে।
খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ, পরিবহন এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে ASC। সেই শাখাতেই কর্মজীবনের শুরু নব্যার।
পাঁচ বছরেই মেজর পদে উন্নতি
২০২১ সালে কমিশন পাওয়ার পর নব্যা সেনাবাহিনীর আর্মি সার্ভিস কর্পসে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। সামরিক জীবনের কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি মেজর পদে উন্নীত হন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছরের কর্মজীবনের মধ্যেই এই পদোন্নতি পান তিনি। এরপরই ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে নতুন দায়িত্বে আসেন।
রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে সাধারণত সেনা, নৌসেনা এবং বায়ুসেনা—তিন বাহিনীর মধ্য থেকেই তরুণ আধিকারিকদের বেছে নেওয়া হয়। মেজর অথবা সমমর্যাদার আধিকারিকদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তাই নব্যার ক্ষেত্রে শুধু মহিলা হিসেবে প্রথম হওয়াই নয়, সেনাবাহিনীর একটি লজিস্টিক শাখা থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক ও প্রটোকল দায়িত্বে পৌঁছনোর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য।
এডিসির আসলে কী কাজ?
রাষ্ট্রপতির এডিসি পদটি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রপতির দৈনন্দিন সরকারি কর্মসূচি এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে এই আধিকারিককে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ের কাজ করতে হয়।
রাষ্ট্রপতি কোথায় যাবেন, কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন, কখন কোন কর্মসূচি রয়েছে—এই ধরনের বিষয়গুলির সঙ্গে এডিসির কাজ সরাসরি যুক্ত থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বৈঠকের সময়সূচি এবং প্রটোকল মেনে চলার ক্ষেত্রেও তিনি সহযোগিতা করেন।
রাষ্ট্রপতি ভবন এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রেও এডিসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বজায় রাখতেও তিনি সহায়তা করেন।
রাষ্ট্রপতির সামরিক প্রটোকলের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এডিসিকে উপস্থিত থাকতে হয়। ফলে পদটি একদিকে যেমন সম্মানের, অন্যদিকে তেমনই দায়িত্বপূর্ণ।
শুধু সেনাবাহিনী নয়, তিন বাহিনী থেকেই এডিসি
রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে সাধারণত ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখা থেকেই আধিকারিক নির্বাচিত হন। সেনাবাহিনী, নৌসেনা এবং বায়ুসেনার তরুণ অফিসাররা এই দায়িত্ব পেতে পারেন।
এই পদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তাঁর সরকারি কর্মসূচির ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জড়িয়ে থাকে। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে সামরিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি প্রটোকল এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন হয়।
নব্যা এই দায়িত্ব পাওয়ার ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। যদিও সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় বহু মহিলা অফিসার ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন, রাষ্ট্রপতির এডিসি পদে সেনা থেকে কোনও মহিলার নিয়োগ এতদিন হয়নি।
২০২৫-এ প্রথম মহিলা এডিসি যশস্বী সোলাঙ্কি
নব্যার আগে ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পান নৌসেনার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার যশস্বী সোলাঙ্কি। তিনিই প্রথম মহিলা আধিকারিক হিসেবে রাষ্ট্রপতির এই দায়িত্বে নিযুক্ত হন।
হরিয়ানার বাসিন্দা যশস্বী ২০১২ সালে ভারতীয় নৌসেনায় যোগ দেন। তিনি নৌসেনার লজিস্টিকস শাখায় শর্ট সার্ভিস কমিশনের অধীনে কাজ করেছেন।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির এডিসি পদে মহিলা আধিকারিকের উপস্থিতি একেবারে নতুন নয়। তবে নব্যা শেখাওয়াতের নিয়োগের মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকেও এই পদে প্রথম মহিলা আধিকারিক এলেন।
এই দুই নিয়োগের ফলে রাষ্ট্রপতির সামরিক দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মহিলা অফিসারদের উপস্থিতির বিষয়টি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
তরুণীদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ নব্যার যাত্রা?
নব্যার কেরিয়ার পথটি বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আগ্রহী তরুণীদের জন্য উল্লেখযোগ্য। রাজস্থানের একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে CDS পরীক্ষায় সাফল্য, অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ এবং সেনাবাহিনীতে কমিশন—পর্যায়ক্রমে এগিয়ে এসেছেন তিনি।
তারপর আর্মি সার্ভিস কর্পসে দায়িত্ব পালন করে মেজর পদে উন্নীত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে নিযুক্ত হওয়া তাঁর সামরিক কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে মহিলাদের জন্য বিভিন্ন শাখা ও দায়িত্বের সুযোগ ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। নব্যার নিয়োগ সেই পরিবর্তনের ধারারই একটি নতুন উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে তাঁর এই নিয়োগের তাৎপর্য শুধু প্রতীকী নয়। রাষ্ট্রপতির মতো দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করার জন্য যে ধরনের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়, নব্যাকে এখন সেই দায়িত্বই সামলাতে হবে।
সামনে বড় দায়িত্ব
রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে নব্যা শেখাওয়াতের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান, সামরিক কর্মসূচি, বৈঠক এবং সফরের সময় প্রটোকল অনুযায়ী সমন্বয় বজায় রাখা তাঁর কাজের অন্যতম অংশ হবে।
রাষ্ট্রপতি ভবনের মতো উচ্চপর্যায়ের সরকারি পরিবেশে বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে।
২০২১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়ার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছনো নব্যার সামরিক কেরিয়ারে অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তবে এই পদে তাঁর কাজের পরিধি এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্বই আগামী দিনে তাঁর কর্মজীবনের নতুন পরিচয় তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে, মেজর নব্যা শেখাওয়াতের রাষ্ট্রপতির এডিসি হিসেবে নিয়োগ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করল। রাজস্থানের কেরপুরা গ্রামের তরুণী থেকে CDS উত্তীর্ণ অফিসার, তারপর আর্মি সার্ভিস কর্পসে দায়িত্ব এবং মেজর পদ—সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছেছেন তিনি। ২০২৫ সালে নৌসেনার যশস্বী সোলাঙ্কির পর এবার সেনাবাহিনী থেকেও মহিলা আধিকারিক এডিসি হলেন। তাঁর এই দায়িত্বপ্রাপ্তি ভারতীয় সামরিক পরিষেবায় মহিলাদের ভূমিকার প্রসারকেও সামনে আনল।



