ওল্ড মঙ্ককে ‘রাম’ বলা যাবে না, আদালতে FSSAI
ওল্ড মঙ্ক নিয়ে বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল বম্বে হাই কোর্টে। শুনানিতে FSSAI-এর হয়ে উপস্থিত আইনজীবী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট পণ্যকে শুধু লেবেল পরিবর্তন করে রাম হিসেবে বাজারজাত করার বিষয়টি দেখা হচ্ছে না। পণ্যটির ভিতরে কী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই উপাদান দিয়ে কীভাবে স্বাদ ও গন্ধ তৈরি করা হচ্ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনায় রয়েছে।
FSSAI-এর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও পানীয়কে রাম হিসেবে বাজারে বিক্রি করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। রামের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাদ ও গন্ধ তৈরির জন্য যে ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলিতে তা যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযোগ, নিউট্রাল স্পিরিটের সঙ্গে কৃত্রিম ফ্লেভার মিশিয়ে রামের মতো স্বাদ এবং গন্ধ তৈরি করা হয়েছে। এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে পণ্যটির পরিচয় নিয়ে আপত্তি ওঠে। FSSAI-এর মতে, এমন পানীয়কে সরাসরি ‘রাম’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
তাহলে লেবেলে কী লেখা থাকবে?
FSSAI আদালতে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট পণ্যকে ‘রাম’ হিসেবে উল্লেখ করার পরিবর্তে লেবেলে ‘রাম ফ্লেভারড স্পিরিট’ ধরনের পরিচয় দিতে হবে।
অর্থাৎ, পণ্যটির গায়ে এমন কোনও শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে ক্রেতার মনে এটি প্রচলিত অর্থে রাম—এমন ধারণা তৈরি হয়। বরং পানীয়টির প্রকৃতি এবং কীভাবে তার স্বাদ তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়টি লেবেলে স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বক্তব্য।
এই অবস্থান কার্যকর হলে ওল্ড মঙ্কের সংশ্লিষ্ট ভ্যারিয়্যান্টের প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বহু বছর ধরে রাম হিসেবে পরিচিত একটি ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে লেবেল বদলের বিষয়টি তাই স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে আদালতে FSSAI-এর বক্তব্যের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যায়নি। প্রস্তুতকারী সংস্থার পক্ষ থেকেও নিজেদের অবস্থান আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
সংশোধিত লেবেল জমা দিয়েছে মোহন মিকিন
ওল্ড মঙ্কের প্রস্তুতকারী সংস্থা মোহন মিকিন ইতিমধ্যেই আদালতের কাছে সংশোধিত লেবেল পেশ করেছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার আপত্তির পর পণ্যের প্যাকেজিংয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই নতুন লেবেলে কী ধরনের তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং তা FSSAI-এর নিয়মের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
FSSAI জানিয়েছে, তারা মোহন মিকিনের জমা দেওয়া সংশোধিত লেবেল খতিয়ে দেখবে। লেবেলে পণ্যের প্রকৃতি, উপাদান এবং তার পরিচয় যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে আপাতত আদালতের শুনানিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান স্পষ্ট হলেও সংশোধিত লেবেল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
শুধু লেবেল নয়, পণ্যের উপাদান নিয়েও আপত্তি
এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, FSSAI-এর আপত্তি শুধুমাত্র প্যাকেটের গায়ে কী লেখা থাকবে, তা নিয়ে নয়। পণ্যের গঠন এবং ব্যবহৃত স্পিরিট নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পানীয়তে নিউট্রাল বা অপরিপক্ব স্পিরিট ব্যবহার করা হয়েছে। তার সঙ্গে কৃত্রিম ফ্লেভার যোগ করে রামের মতো স্বাদ ও গন্ধ তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সাধারণভাবে রামের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উৎপাদন ও পরিপক্বতার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অন্য উপায়ে একই ধরনের স্বাদ-গন্ধ তৈরি করা হলে পণ্যটিকে কী নামে বাজারজাত করা হবে, সেটিই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বড় প্রশ্ন।
এই কারণেই FSSAI বিষয়টিকে কেবল ‘লেবেলিং সংক্রান্ত ভুল’ হিসেবে দেখছে না।
‘৭ বছরের পুরনো ব্লেন্ডেড’ দাবিতেও আপত্তি
ওল্ড মঙ্কের বিরুদ্ধে আগেই যে অভিযোগ সামনে এসেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল বয়স সংক্রান্ত দাবি।
‘ওল্ড মঙ্ক XXX রাম’-এর একটি ভ্যারিয়্যান্টের লেবেলে ‘৭ বছরের পুরনো ব্লেন্ডেড’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। FSSAI-এর মতে, এই দাবি বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট মিশ্রণে নিউট্রাল বা অপরিপক্ব স্পিরিটের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে পরিপক্ব রামের অংশ ছিল ৫ শতাংশেরও কম।
এই পরিস্থিতিতে পুরো পানীয়কে সাত বছরের পুরনো ব্লেন্ডেড রাম হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা নিয়মসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে FSSAI।
বয়সের উল্লেখের ক্ষেত্রে কী নিয়ম?
FSSAI-এর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও মিশ্রিত অ্যালকোহলিক পানীয়তে বয়সের দাবি বা ‘এজ স্টেটমেন্ট’ করার ক্ষেত্রে মিশ্রণে ব্যবহৃত স্পিরিটগুলির বয়সের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মিশ্রণে থাকা স্পিরিটগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সি উপাদানের ভিত্তিতেই বয়স সংক্রান্ত দাবি করতে হয়। ফলে কোনও মিশ্রণে অল্প পরিমাণে পুরনো স্পিরিট থাকলেই পুরো পণ্যকে সেই বয়সের বলে প্রচার করা যায় না।
ওল্ড মঙ্কের সংশ্লিষ্ট ভ্যারিয়্যান্টকে ঘিরে FSSAI-এর আপত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এটাই। সংস্থার মতে, লেবেলে দেওয়া বয়সের দাবি এবং পণ্যের প্রকৃত গঠন একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
এই নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগেই পণ্যের লেবেল নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আপত্তি তুলেছে।
শুধু ওল্ড মঙ্ক নয়, আরও ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
FSSAI-এর বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। শুধু ওল্ড মঙ্ক নয়, অন্যান্য অ্যালকোহলিক পানীয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা আগে সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থা।
কিছু ব্র্যান্ডের হুইস্কি এবং রামের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট পানীয়ের স্বাদ ও গন্ধ তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ বিষয়টি কোনও একটি ব্র্যান্ডকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যালকোহলিক বেভারেজের ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত উপাদান, উৎপাদন পদ্ধতি এবং লেবেলে তার সঠিক পরিচয় দেওয়ার বিষয়টি নিয়েই নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
ক্রেতাদের কাছে সঠিক তথ্য দেওয়াই মূল প্রশ্ন
খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থানের পিছনে অন্যতম যুক্তি হল, পণ্যের লেবেল দেখে ক্রেতা যাতে পানীয়টির প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা না পান।
কোনও পানীয় যদি রামের মতো স্বাদযুক্ত হয়, কিন্তু তার প্রধান উপাদান বা উৎপাদন পদ্ধতি প্রচলিত রামের সংজ্ঞার সঙ্গে না মেলে, তাহলে সেটিকে একই নামে বিক্রি করা হলে ক্রেতার কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছতে পারে।
এই কারণেই পণ্যের নাম, উপাদান এবং বয়স সংক্রান্ত দাবি—সবকিছুই নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে রাখার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ওল্ড মঙ্কের ক্ষেত্রেও FSSAI-এর আপত্তির মূল জায়গাগুলির একটি এই স্বচ্ছতা। প্যাকেটের সামনে কী লেখা হচ্ছে এবং ভিতরে আসলে কী রয়েছে—দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর
এখন নজর রয়েছে মোহন মিকিনের জমা দেওয়া সংশোধিত লেবেলের উপর। FSSAI সেটি পরীক্ষা করে দেখবে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে লেবেলটি গ্রহণ করা যায় কি না, সেই বিষয়ে অবস্থান জানাবে।
ফলে আদালতে FSSAI-এর বক্তব্য সামনে এলেও ওল্ড মঙ্কের ভবিষ্যৎ বাজারজাতকরণ নিয়ে চূড়ান্ত ছবি এখনও স্পষ্ট নয়। সংশোধিত লেবেল অনুমোদিত হলে পণ্যটি কী নামে এবং কী পরিচয়ে বাজারে থাকবে, সেটিও তখন পরিষ্কার হবে।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার আপত্তি যদি বহাল থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারজাতকরণ পদ্ধতিতে আরও পরিবর্তন করতে হতে পারে।
ওল্ড মঙ্ক বিতর্কে নতুন মোড়
দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্র্যান্ড ওল্ড মঙ্ককে ঘিরে FSSAI-এর এই অবস্থান অ্যালকোহলিক বেভারেজ শিল্পে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এতদিন যে পণ্যটি সাধারণ ক্রেতাদের কাছে রাম হিসেবেই পরিচিত ছিল, সেটির পরিচয় নিয়েই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আদালতে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে এই মুহূর্তে সব ধরনের ওল্ড মঙ্ক পণ্যের উপর একই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য—এমনটা বলা ঠিক হবে না। FSSAI-এর আপত্তি নির্দিষ্ট পণ্য ও তার গঠন এবং লেবেল সংক্রান্ত দাবিকে ঘিরে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশোধিত লেবেল এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের নিয়মগত মূল্যায়নের উপর। আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং FSSAI-এর পর্যালোচনার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
সব মিলিয়ে, ওল্ড মঙ্ককে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু একটি ব্র্যান্ডের লেবেল পরিবর্তনের প্রশ্নে আটকে নেই। পণ্যটি আসলে কোন শ্রেণির পানীয়, কী উপাদানে তৈরি এবং ক্রেতার সামনে সেটিকে কী নামে উপস্থাপন করা হবে—এই তিনটি বিষয়ই এখন কেন্দ্রবিন্দুতে। বম্বে হাই কোর্টে FSSAI-এর বক্তব্যের পর মোহন মিকিনের সংশোধিত লেবেলের দিকে নজর রয়েছে। সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গ্রহণ করে কি না, তার উপরই পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে।



