পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে নতুন মোড়। শনিবার সকাল থেকেই কলকাতা ও তার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে তল্লাশি অভিযানে নামে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কামারহাটির তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রের নাম। তাঁর একাধিক ঠিকানায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে তল্লাশি চালানো হয়।
সূত্রের খবর, এদিন ভোর থেকেই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় মোট আটটি জায়গায় অভিযান শুরু করে ইডি। সেই তালিকায় রয়েছে মদন মিত্রের ভবানীপুর, কালীঘাট, জোকা এবং দক্ষিণেশ্বরের একাধিক ঠিকানা। তদন্তকারীরা একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে তল্লাশি শুরু করেন, যাতে নথি বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরিয়ে ফেলার সুযোগ না থাকে।
জানা গিয়েছে, বর্তমানে মদন মিত্র পরিবারের সঙ্গে ভবানীপুরের একটি ফ্ল্যাটে রয়েছেন। সকাল প্রায় ছ'টা নাগাদ সেখানে পৌঁছে যান ইডি আধিকারিকরা। তাঁদের সঙ্গে ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের একটি দল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয় এবং বিধায়ককে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় বলে সূত্রের দাবি।
ইডি সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, তল্লাশি অভিযানের সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি বিধায়কের সঙ্গে যুক্ত ছ'টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে খবর। তবে ওই নথি বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলির সঙ্গে পুরনিয়োগ দুর্নীতির প্রত্যক্ষ কোনও যোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও সরকারি ভাবে কিছু জানানো হয়নি।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই অভিযানের সূত্রপাত ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়া অয়ন শীলকে কেন্দ্র করেই। প্রায় তিন বছর আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ, তাঁর সংস্থা রাজ্যের একাধিক পুরসভায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তদন্তে উঠে আসে, কয়েকটি পুরসভায় গ্রুপ ডি কর্মী, টাইপিস্ট এবং অন্যান্য নিম্নপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি, নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধাপে অয়ন শীলের সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ওএমআর শিট প্রস্তুত করা, ইন্টারভিউয়ের আয়োজন এবং পরীক্ষার আনুষঙ্গিক বিভিন্ন দায়িত্বও তাদের হাতেই ছিল। অভিযোগ, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং সেই অর্থের উৎস ও গতিপথ খুঁজে দেখছে ইডি।
তদন্তের আওতায় থাকা পুরসভাগুলির মধ্যে কামারহাটি পুরসভার নামও রয়েছে। সেই কারণেই ওই পুরসভার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রশাসনিক কর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, স্থানীয় প্রশাসন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, অয়ন শীলের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় পাওয়া কিছু তথ্য ও নথির ভিত্তিতেই মদন মিত্রের একাধিক ঠিকানায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখতে চাইছেন, কামারহাটি পুরসভার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও ধরনের অনিয়মে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক স্তরের কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল কি না।
শুধু মদন মিত্রের ঠিকানাই নয়, এদিন বেলেঘাটা, সন্তোষপুরের একটি ক্লাব এবং বেহালার একটি ঠিকানাতেও অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে নথি, ইলেকট্রনিক তথ্য এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কয়েক দিন আগেই কামারহাটি পুরসভার এক আধিকারিকের বাড়িতেও তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। সেই অভিযানে পাওয়া কিছু তথ্যের সূত্র ধরেও বর্তমান তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ফলে গোটা তদন্তে কামারহাটি পুরসভা এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজ্যের নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় গত কয়েক বছরে একাধিক রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্তা এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নাম উঠে এসেছে। পুরনিয়োগ দুর্নীতির তদন্তও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন নাম ও আর্থিক লেনদেনের সূত্র সামনে আসছে।
তবে এখনও পর্যন্ত মদন মিত্রের বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ বা অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। শনিবারের অভিযান মূলত তথ্য সংগ্রহ এবং জিজ্ঞাসাবাদের অংশ বলেই তদন্তকারী সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। উদ্ধার হওয়া নথি ও ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।
এদিকে, সকাল থেকেই মদন মিত্রের বাড়ির বাইরে রাজনৈতিক কর্মী, কৌতূহলী মানুষ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ভিড় জমতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে চলতে থাকে তল্লাশি অভিযান।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে, বিরোধীরা এই ঘটনাকে শাসকদলের বিরুদ্ধে বড় প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। যদিও তৃণমূলের তরফে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
সব মিলিয়ে, শনিবারের ইডি অভিযান পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উদ্ধার হওয়া নথি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং অয়ন শীলের বয়ানের ভিত্তিতে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।



