পানিহাটির ঐতিহাসিক শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রণামীর অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরের সেবাইত অভিযোগ করেছেন, প্রণামী বাক্সে জমা অর্থ গণনার বিষয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথের স্বামী শেখর দেবনাথ।
ঘটনাকে ঘিরে একটি অডিও রেকর্ডিংও প্রকাশ্যে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও শেখর দেবনাথ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এবং ভাইরাল অডিওর সম্পূর্ণ অংশ শোনার আবেদন জানিয়েছেন।
পানিহাটির শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দির স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। বিশেষ করে দণ্ডমহোৎসব উপলক্ষে প্রতিবছর লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়। উৎসবের সময়ে মন্দিরে প্রণামীর পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, দণ্ডমহোৎসব শুরুর আগের সন্ধ্যায় শেখর দেবনাথ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে যান। সেখানে মন্দিরের প্রণামী বাক্স এবং তার চাবি কার কাছে রয়েছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
মন্দিরের সেবাইত বঙ্কুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তিনি জানান যে তাঁদের পরিবারই বংশপরম্পরায় মন্দিরের পূজা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছে। সেই সময় তাঁকে জানানো হয়, মন্দিরের ভিতর ও বাইরের সমস্ত প্রণামী বাক্সে জমা অর্থ বিধায়কের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গণনা করা হবে।
বঙ্কুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, তিনি এই প্রস্তাবে আপত্তি জানান এবং বলেন, এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে লিখিত নির্দেশ প্রয়োজন। তাঁর দাবি, এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই অভিযোগের ভিত্তিতে এখনও পর্যন্ত থানায় বা অন্য কোনও প্রশাসনিক সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
ঘটনাটি সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ অভিযোগের সঙ্গে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবারের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
অন্যদিকে শেখর দেবনাথ সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ভাইরাল হওয়া অডিওর একটি অংশ প্রচার করা হয়েছে, সম্পূর্ণ কথোপকথন শুনলে প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
তিনি দাবি করেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের উন্নয়ন এবং প্রণামীর অর্থ ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতা আনা। সেই লক্ষ্যেই একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
শেখর দেবনাথের কথায়, তিনি কখনও প্রণামীর অর্থ বিধায়কের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গণনার নির্দেশ দেননি। যদি অন্য কেউ এমন মন্তব্য করে থাকেন, তার দায় তাঁর নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
এই ঘটনার পর মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বহু প্রাচীন মন্দিরে এখনও পারিবারিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের প্রথা চালু রয়েছে। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের দাবিও উঠছে।
পানিহাটির এই ঘটনাও সেই বৃহত্তর বিতর্ককে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে সেবাইতের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের পাল্টা দাবি—দুইয়ের মধ্যে সত্যতা কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যেহেতু এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয়নি বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরুর কথা জানানো হয়নি, তাই বিষয়টি আপাতত অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।
আগামী দিনে এই ঘটনায় প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।



