নেপাল সফরেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে
গত ২১ আগস্ট একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে মানস সরোবর যাত্রায় বেরিয়েছিলেন বসিরহাটের বাসিন্দা অনুকূল পোদ্দার ও রেবা রায় পোদ্দার। পরিকল্পনা অনুযায়ী নেপাল সফরের পর তাঁদের আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাত্রার মাঝপথেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
বিপর্যয়ের দিন সকালে কাঠমান্ডু থেকে গাড়িতে করে রওনা দিয়েছিলেন তাঁরা। তখনও তাঁরা জানতেন না, সামনে অপেক্ষা করছে ভয়াবহ বিপদ। তাঁদের সঙ্গে থাকা পর্যটকদের মধ্যে বাঙালি পরিবার যেমন ছিল, তেমনই দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি পরিবারও ছিল।
সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ যাত্রা শুরু হওয়ার পর কিছুটা এগোতেই পরিস্থিতির পরিবর্তন চোখে পড়ে। দূরের পাহাড় থেকে অস্বাভাবিক গতিতে জল নেমে আসতে দেখেন গাড়ির চালক।
চালকের চোখে পড়তেই বদলে যায় পরিস্থিতি
দম্পতির বর্ণনা অনুযায়ী, দূর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে সাদা ধোঁয়ার মতো জল নেমে আসছিল। প্রথম মুহূর্তে বিষয়টির ভয়াবহতা বোঝা যায়নি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মানুষজন নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করেন। গাড়িতে থাকা শিশুদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে চালক আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি।
তিনি দ্রুত গাড়িটি পিছনের দিকে নিয়ে যান। এরপর ডানদিকের একটি রাস্তা ধরে পাহাড়ের তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় উঠে গিয়ে গাড়ি থামান। সেই সিদ্ধান্তই কার্যত তাঁদের জীবন বাঁচিয়ে দেয় বলে মনে করছেন দম্পতি।
তাঁদের কথায়, সেই সময় চালক যদি গাড়ি ঘোরানোর সিদ্ধান্ত না নিতেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
মাত্র দেড় ঘণ্টার দূরত্বে ছিল বিপর্যস্ত এলাকা
সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় ছিল, যে অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান নেমেছিল, সেখান থেকে তাঁদের অবস্থান খুব বেশি দূরে ছিল না। দম্পতিরা জানিয়েছেন, বিপর্যস্ত এলাকা থেকে তাঁদের অবস্থান ছিল আনুমানিক দেড় ঘণ্টার দূরত্বে।
এর মধ্যেই ট্যুর ম্যানেজারের কাছ থেকে তাঁদের কাছে ফোন আসে। জানানো হয়, ইমিগ্রেশন অফিসের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু হড়পা বানের জলে ভেসে গিয়েছে।
এই খবর পাওয়ার পর আর ঝুঁকি না নিয়ে দলটিকে কাঠমান্ডুর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিরাপদে রাজধানীতে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
পরে সামনে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়ের ছবি
কাঠমান্ডুতে ফিরে আসার পরই ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের প্রকৃত মাত্রা তাঁদের সামনে আসে। নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় হড়পা বান ও প্রবল জলের স্রোতে রাস্তা, সেতু এবং বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আসতে থাকে।
যে পথে তাঁরা কিছুক্ষণ আগেই যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সেই পথের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। কোথাও রাস্তার অস্তিত্ব নেই, কোথাও কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপ জমে রয়েছে—এমন ছবি সামনে আসতে থাকে।
তখনই দম্পতি উপলব্ধি করেন, গাড়িচালকের কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত তাঁদের কত বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলায় ফেরার স্বস্তি
নেপালে আটকে পড়ার পর দেশে ফেরার প্রক্রিয়া নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ ছিল। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া একাধিক পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। ফলে তাঁদের পরিবারের মধ্যেও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিতে রাজ্য প্রশাসনও সক্রিয় হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং নিরাপদে রাজ্যে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অবশেষে রবিবার ভোরে ট্রেনে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছন অনুকূল ও রেবা। তাঁদের নিতে সেখানে উপস্থিত ছিল বসিরহাট থানার আইসি-সহ পুলিশের একটি দল। পুলিশের গাড়িতেই দম্পতিকে তাঁদের বাড়ির উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রতিবেশীদের মুখে স্বস্তি
দীর্ঘ অপেক্ষার পর দম্পতি বাড়ি ফেরায় স্বস্তি নেমে আসে বসিরহাটে। প্রতিবেশীরা ফুল দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানান।
তবে বাড়ি ফিরলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। পাহাড় থেকে আচমকা জল নেমে আসা, মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি, শিশুদের কান্না এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির স্মৃতি এখনও তাঁদের মনে তাজা।
একটি ভ্রমণ মুহূর্তের মধ্যে কীভাবে প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে পরিণত হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে কার্যত জীবনের এক ভয়াবহ শিক্ষা হয়ে থাকল।
নেপাল বিপর্যয়ে এখনও উদ্বেগ
নেপালের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বহু মানুষ নিখোঁজ এবং প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
এর মধ্যেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাওয়া পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও একাধিক মানুষ নেপালে গিয়ে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন।
বসিরহাটের অনুকূল ও রেবা নিরাপদে ফিরে এলেও অন্য নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের উৎকণ্ঠা এখনও কাটেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সন্ধান ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে, নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে বসিরহাটের এই দম্পতির ফিরে আসার ঘটনা যেমন পরিবার ও প্রতিবেশীদের স্বস্তি দিয়েছে, তেমনই কয়েক মিনিটের সতর্কতা যে কত বড় বিপদ থেকে জীবন বাঁচাতে পারে, তারও নজির হয়ে থাকল এই ঘটনা।



