ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সোমবারের অধিবেশন উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহ তৈরি করে। দীর্ঘ আলোচনার পর যখন বিলটি ভোটাভুটির পর্যায়ে পৌঁছয়, তখনই ঘটে নাটকীয় মোড়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী হিসেবে পরিচিত তৃণমূলের একাংশের বিধায়ক ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই বিধানসভা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তবে দলের সব সদস্য একই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেননি।
বিধানসভা সূত্রের দাবি, স্পিকার ভোটাভুটির ঘোষণা করার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কয়েকজন বিধায়ক কক্ষ ত্যাগ করতে পারেননি। নিয়ম অনুযায়ী ভোটাভুটি শুরু হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের আর বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁরা অধিবেশন কক্ষের ভিতরেই থেকে যান, যদিও শেষ পর্যন্ত ভোট প্রদানে অংশ নেননি।
যাঁরা কক্ষে থেকে যান তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক বাহারুল ইসলাম, হাসনের বিধায়ক কাজল শেখ, বসিরহাট উত্তরের বিধায়ক তৌসিফুর রহমান, সাগরদিঘির বিধায়ক বায়রন বিশ্বাস এবং মুরারইয়ের বিধায়ক মোশারফ হোসেন। বিধানসভার ভেতরে উপস্থিত থাকলেও তাঁরা ভোটদান থেকে বিরত থাকেন।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহা, শিউলি সাহা-সহ একাধিক বিধায়ক ভোটাভুটির আগেই অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরে ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর তাঁরা ফের বিধানসভায় ফিরে আসেন।
এই ঘটনাকে ঘিরে দুই তৃণমূল শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের অন্যতম মুখ এবং বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ বিধানসভার ভিতরে থাকা বিধায়কদের অভিনন্দন জানান। তাঁদের উদ্দেশে তিনি মন্তব্য করেন, কক্ষে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। যদিও তাঁর এই মন্তব্যের জবাবে ঋতব্রত শিবিরের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সোমবারের অধিবেশনের শুরুতেই সরকার ওবিসি সংশোধনী বিল উত্থাপন করে। বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বিরোধী সদস্যরা একাধিক প্রশ্ন তুললেও শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিলটি পাস করাতে কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি সরকারকে।
ভোটাভুটির ফলাফলে দেখা যায়, বিলটির পক্ষে ১৮৬টি ভোট পড়ে। বিপক্ষে ভোট দেন ১৭ জন বিধায়ক। এছাড়া ছয়জন সদস্য ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের ওই পাঁচ বিধায়ক, যারা কক্ষে উপস্থিত থাকলেও ভোট দেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে ওয়াকআউট এবং পরে কয়েকজন বিধায়কের ভিতরে থেকে ভোটদান থেকে বিরত থাকার ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে রাজ্যে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। সরকার দাবি করছে, নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আইনগতভাবে শক্তিশালী করা হবে এবং পূর্ববর্তী আইনি জটিলতা দূর করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, বিলটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সংরক্ষণ নীতিকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতি করা হচ্ছে।
এই আবহেই বিধানসভার ভোটাভুটিতে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের অবস্থান নতুন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একদিকে কক্ষ ত্যাগ, অন্যদিকে উপস্থিত থেকেও ভোট না দেওয়া—এই দ্বৈত অবস্থান আগামী দিনে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
বিধানসভার এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, ওবিসি সংশোধনী বিল শুধু আইন প্রণয়নের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দলীয় বিভাজনের নতুন অধ্যায়কেও সামনে নিয়ে এসেছে।



