ভোররাতে সফল উৎক্ষেপণ GSLV-F17-এর
গোটা দেশ যখন ঘুমে, তখনই শ্রীহরিকোটার উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে আকাশের দিকে ছুটে যায় GSLV-F17 রকেট। শুক্রবার ভোর ২টা ৫৫ মিনিটে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত উৎক্ষেপণ। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে গিয়ে মাত্র ১৯ মিনিটের মধ্যে EOS-05-কে তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করতে সক্ষম হয় ইসরো।
উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার পরই বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। কারণ, বছরের শুরুতেই ইসরোর একটি মহাকাশ অভিযানে বড় ব্যর্থতা হয়েছিল। PSLV-C62-এর মাধ্যমে একাধিক উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানোর চেষ্টা সফল হয়নি। সেই ঘটনার পর ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে EOS-05 মিশনের সাফল্য সেই হতাশা অনেকটাই কাটিয়ে দিল। জটিল উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় ইসরোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার উপরও নতুন করে আস্থা তৈরি হয়েছে।
‘নটি বয়’ রকেটেই বড় সাফল্য
EOS-05-কে মহাকাশে পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল GSLV রকেটকে। বিজ্ঞানমহলে এই রকেটের একটি পরিচিত ডাকনাম রয়েছে—‘নটি বয়’। কারণ, অতীতে এই সিরিজের কয়েকটি উৎক্ষেপণে ব্যর্থতার ঘটনা ঘটেছে।
তবু গুরুত্বপূর্ণ এই মিশনের জন্য GSLV-এর উপরই আস্থা রেখেছিল ইসরো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর আগে হওয়া ১৯টি উৎক্ষেপণের মধ্যে ছয়টি সফল হয়নি। ফলে নতুন উৎক্ষেপণের আগে রকেটটির সাফল্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ ছিল বিজ্ঞানী মহলে।
কিন্তু এবার সমস্ত আশঙ্কা কাটিয়ে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেছে GSLV-F17। উৎক্ষেপণ থেকে উপগ্রহ স্থাপন—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় মিশনটিকে ইসরোর জন্য বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মহাকাশে ভারতের ‘চোখ’ EOS-05
EOS-05 মূলত একটি পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এটি জিওসিনক্রোনাস অরবিট থেকে পৃথিবীর উপর নজর রাখবে।
পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করে উপগ্রহটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করবে। ফলে ভারতের হাতে এমন একটি মহাকাশভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আসছে, যা বিভিন্ন দিক থেকে পৃথিবীর ছবি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে।
এই কারণেই EOS-05-কে কার্যত ভারতের ‘আই অফ দ্য স্কাই’ বা মহাকাশের চোখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উপগ্রহের পাঠানো ছবি ও তথ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দুর্যোগের আগাম সতর্কতায় বড় ভূমিকা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় EOS-05-এর তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিধস, দাবানল বা অন্য কোনও বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে উপগ্রহ থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছতে পারে।
বিশেষ করে কোনও দুর্যোগের গতিপথ বা বিস্তারের ছবি নিয়মিত পাওয়া গেলে উদ্ধার ও ত্রাণ পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেও এই উপগ্রহের ছবি কাজে লাগানো যেতে পারে।
দুর্যোগের পরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং দুর্গত এলাকার মানচিত্র তৈরির ক্ষেত্রেও উপগ্রহ-নির্ভর তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ফলে EOS-05 শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নয়, বাস্তব প্রশাসনিক কাজেও কার্যকর হতে পারে।
কৃষি ও আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও নজর
পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার কৃষিক্ষেত্রে। জমির অবস্থা, ফসলের পরিস্থিতি, মাটির পরিবর্তন এবং কৃষিজমির বিস্তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করা যায়।
EOS-05-এর মাধ্যমে পাওয়া পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য কৃষি পরিকল্পনা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। কোন এলাকায় ফসলের পরিস্থিতি কেমন, কোথায় অতিরিক্ত জল জমেছে বা কোথায় পরিবেশগত পরিবর্তন হচ্ছে—এই ধরনের বিষয়ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
আবহাওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহেও উপগ্রহের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে EOS-05 থেকে পাওয়া ডেটা বিজ্ঞানীদের কাজে আসতে পারে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বাড়বে নজরদারি ক্ষমতা
EOS-05-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের উচ্চমানের ছবি ও পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।
সীমান্ত এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং সংবেদনশীল অঞ্চলের উপর নজরদারিতে মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সেই জায়গায় নতুন উপগ্রহ ভারতের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে EOS-05-এর নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবহার এবং কী ধরনের তথ্য কোন সংস্থা পাবে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সরকারি ভাবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এটুকু বলা যায় যে, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই মিশন গুরুত্বপূর্ণ।
কেন জিওসিনক্রোনাস অরবিট গুরুত্বপূর্ণ?
EOS-05-এর কক্ষপথও এই মিশনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। জিওসিনক্রোনাস অরবিটে অবস্থান করার ফলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলের উপর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়।
সাধারণ পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী অনেক উপগ্রহ নির্দিষ্ট সময় অন্তর কোনও অঞ্চলের উপর দিয়ে যায়। কিন্তু জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য আলাদা। ফলে নির্দিষ্ট এলাকার উপর নজর রাখার ক্ষেত্রে এই ধরনের কক্ষপথ বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।
ভারতের মতো বড় ও ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশের জন্য মহাকাশ থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ এবং নিরাপত্তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
বছরের শুরুর ব্যর্থতার পর বড় প্রত্যাবর্তন
ইসরোর এবারের সাফল্যের গুরুত্ব বোঝার জন্য বছরের শুরুতে ঘটে যাওয়া ব্যর্থতার কথাও মনে রাখতে হচ্ছে। PSLV-C62 মিশনে একাধিক উপগ্রহকে কক্ষপথে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই অভিযান প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি।
সেই ব্যর্থতার পর স্বাভাবিকভাবেই ইসরোর পরবর্তী উৎক্ষেপণগুলির দিকে নজর ছিল। বিশেষ করে GSLV-এর মতো অতীতের কয়েকটি ব্যর্থতার সাক্ষী হওয়া রকেট দিয়ে EOS-05 উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্তের দিকে বিজ্ঞানী মহলেরও নজর ছিল।
শেষ পর্যন্ত উৎক্ষেপণ সফল হওয়ায় সেই চাপ অনেকটাই কেটে গেল। একইসঙ্গে পরবর্তী মহাকাশ অভিযানের জন্যও ইসরো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর অভিনন্দন
EOS-05-এর সফল উৎক্ষেপণের পর ইসরোকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি এই সাফল্যকে দেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংও ইসরোর বিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্ট দলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিনন্দন বার্তায় দেশের মহাকাশ গবেষণায় এই সাফল্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং একাধিক ধাপের সমন্বয়ের পর এই সাফল্য এসেছে। ফলে উৎক্ষেপণের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
সামনে আরও বড় মহাকাশ কর্মসূচি
EOS-05-এর সফল উৎক্ষেপণ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পৃথিবী পর্যবেক্ষণ থেকে যোগাযোগ, নেভিগেশন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মিশনের মাধ্যমে ইসরোর পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাও নতুন মাত্রা পেল। ভবিষ্যতে EOS-05 থেকে পাওয়া তথ্য কীভাবে বিভিন্ন সরকারি ও বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহার করা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
সব মিলিয়ে, বছরের শুরুতে ব্যর্থতার ধাক্কা সামলে GSLV-F17-এর সফল উৎক্ষেপণ ইসরোর জন্য নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। ‘নটি বয়’ নামে পরিচিত রকেটটির উপর আস্থা রেখে EOS-05-কে সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর উপর নজর রাখা এই উপগ্রহ আগামী দিনে দুর্যোগ মোকাবিলা, কৃষি, আবহাওয়া, পরিবেশ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার।



