নির্ধারিত সময়ের আগেই সিজিও কমপ্লেক্সে অভিষেক
সোমবার সকাল থেকেই কলকাতার সিজিও কমপ্লেক্স চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা। নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই বেলা প্রায় ১১টা নাগাদ সেখানে পৌঁছন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগে সকাল সওয়া দশটা নাগাদ নিজের বাসভবন থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
ইডি সূত্রে খবর, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় তাঁর কাছে বেশ কিছু নতুন তথ্য ও নথি নিয়ে প্রশ্ন করা হতে পারে। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন, সংস্থার সম্পত্তি এবং কয়েকটি সন্দেহজনক ট্রানজ্যাকশনের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তের কেন্দ্রে ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’
নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে একাধিকবার উঠে এসেছে ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ নামের সংস্থার প্রসঙ্গ। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে, যার উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, শিক্ষা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ এই সংস্থার বিভিন্ন আর্থিক কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, অবৈধ অর্থকে বৈধ দেখানোর চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। সেই কারণেই সংস্থার হিসাবপত্র, সম্পত্তির নথি এবং আর্থিক কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যদিও ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ বা নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলিকে টার্গেট করা হচ্ছে।
আগেও হয়েছে দীর্ঘ জেরা
এটাই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিকবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সামনে হাজিরা দিয়েছেন তৃণমূলের এই নেতা। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অতীতেও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রতিবারই তিনি তদন্তে সহযোগিতা করেছেন বলে দাবি করেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল।
অন্যদিকে, গত কয়েক মাসে রাজ্যের বিভিন্ন আলোচিত মামলায়ও তদন্তকারী সংস্থার সামনে একাধিকবার উপস্থিত হতে হয়েছে অভিষেককে। বিধানসভার স্বাক্ষর জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলায় ভবানীভবনে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাঁকে জেরা করা হয়েছিল। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টার ওই জিজ্ঞাসাবাদ রাজনৈতিক মহলেও যথেষ্ট চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
সম্পত্তি নিয়েও বাড়ছে নজরদারি
সাম্প্রতিক সময়ে ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর সম্পত্তি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শাসক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সংস্থাটির সম্পত্তির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
তদন্তকারী মহলের একটি অংশের মতে, সংস্থার নামে থাকা বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি, অফিস এবং আর্থিক সম্পদের উৎস ও হিসাব খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই এবারের জেরায় সম্পত্তি ক্রয়, বিনিয়োগের উৎস এবং আর্থিক লেনদেনের নথি নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ তৃণমূলের
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে চাপে রাখতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, ভোটের আগে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বারবার তদন্তের গতি বাড়িয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও অতীতে বহুবার দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। তদন্তের নামে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে বারবার হেনস্তা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
তবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অবস্থান ভিন্ন। তাদের দাবি, তদন্তে যে সমস্ত তথ্য ও আর্থিক নথি সামনে এসেছে, তার ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করা হচ্ছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ সেই তদন্ত প্রক্রিয়ারই অংশ।
সামনে আরও আইনি লড়াই
সোমবার ইডির জেরার পরও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি ব্যস্ততা কমছে না। সূত্রের খবর, আগামী দিনেও তাঁকে অন্য একটি মামলায় তদন্তকারীদের সামনে হাজিরা দিতে হতে পারে।
রাজ্যের বহুচর্চিত নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন আর্থিক তথ্য এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার নাম উঠে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই হাজিরা রাজনৈতিক ও আইনি— দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এখন নজর থাকবে ইডির জিজ্ঞাসাবাদের পর নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না এবং তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই।



