তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমশ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। দলের প্রকৃত নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই শিবিরের টানাপোড়েন এবার নির্বাচন কমিশনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী কয়েকজন বিধায়ক ও নবগঠিত কমিটির প্রতিনিধিরা কলকাতায় মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কার্যালয়ে গিয়ে একাধিক নথি জমা দেন।
ঋতব্রতপন্থীদের দাবি, সম্প্রতি আয়োজিত একটি বিশেষ অধিবেশনে দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই বৈঠকের কার্যবিবরণী, সিদ্ধান্তপত্র এবং নতুন নেতৃত্বের তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, দলীয় সংবিধান অনুযায়ী সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সূত্রের খবর, ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে দলের চেয়ারম্যান পদে অরূপ রায়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩০ সদস্যের একটি জাতীয় কর্মসমিতিও গঠন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তাঁদের লক্ষ্য প্রতীক দখল করা নয়, বরং প্রকৃত সংগঠনের স্বীকৃতি পাওয়া। তাঁর দাবি, তাঁরা যে সংগঠন পরিচালনা করছেন সেটিই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস এবং সেই কারণেই আলাদা করে প্রতীক দাবি করার প্রয়োজন নেই।
ঋতব্রতের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর। তিনি বলেন, দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকের সমস্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে এবং সেই বৈঠকের ভিত্তিতেই নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, দলীয় প্রতিনিধিত্ব ও সংখ্যাগত সমর্থনের বিচারে তাঁদের অবস্থানই শক্তিশালী।
এই প্রতিনিধি দলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি ছিলেন অরূপ রায়, জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং আখরুজ্জামান। কমিশনের কাছে জমা দেওয়া নথিতে বিশেষ অধিবেশনের সিদ্ধান্তগুলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক সমীকরণে ঋতব্রত শিবিরের শক্তি আরও বাড়ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিধানসভা চত্বরে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। সম্প্রতি তিনি কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তাঁর এই পদক্ষেপ নতুন রাজনৈতিক জল্পনা উসকে দিয়েছে।
এছাড়াও বজবজের প্রবীণ বিধায়ক অশোক দেবও ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও পক্ষ বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে ঋতব্রতপন্থী শিবিরের পক্ষে একদল আইনজীবী বৈঠক করেছে। সেখানে দলীয় সাংগঠনিক পরিবর্তন সংক্রান্ত নথিপত্র এবং আইনি অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী দিনে প্রতীক ও দলীয় স্বীকৃতি নিয়ে বড় আইনি ও সাংবিধানিক লড়াই শুরু হতে পারে। জানা গিয়েছে, আগামী সপ্তাহে কয়েকজন বিধায়ক নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা করেছেন। সেখানে তাঁরা দলের প্রতিনিধিত্ব এবং সাংগঠনিক বৈধতা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।
তবে এই সমস্ত দাবিকে শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির। তাঁদের বক্তব্য, যে বৈঠকের কথা ঋতব্রতরা বলছেন, তার কোনও সাংগঠনিক বা আইনি বৈধতা নেই। কালীঘাট শিবিরের দাবি, দলের সাংবিধানিক চেয়ারম্যান এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেই তথ্য ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
তাঁদের মতে, দলের প্রকৃত সাংগঠনিক কাঠামো, জাতীয় কর্মসমিতি এবং নেতৃত্ব সম্পর্কিত তথ্য কমিশনের কাছে আগে থেকেই নথিভুক্ত রয়েছে। ফলে বিকল্প কোনও তালিকা বা কমিটি জমা দিলেই তা বৈধতা পাবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাংগঠনিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে সংখ্যাগত শক্তির প্রশ্ন, অন্যদিকে দলীয় সংবিধান ও বৈধতার প্রশ্ন— দুইয়ের সংঘাত এখন নির্বাচন কমিশনের টেবিলে পৌঁছে গিয়েছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে কমিশনের অবস্থান, উভয় পক্ষের নথিপত্র এবং আইনি যুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে, দলের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের লড়াই এখন আর কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার মাধ্যমে সেই সংঘাত নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল, যার প্রভাব রাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অনুভূত হতে পারে।



