একই দিনে দুই গ্রামে হামলা
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার ভোররাতে তামেংলং জেলার তোলেন গ্রামে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, সশস্ত্র কয়েকজন হামলাকারী একটি বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
ওই বাড়িতে ছিলেন এক যুবক, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের ছয় বছরের সন্তান। হামলায় গুরুতর আহত হন পরিবারের তিন সদস্যই। তাঁদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দম্পতির মৃত্যু হয়। তাঁদের ছেলেটিও গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শিশুকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
প্রথম ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ফের হামলার খবর আসে তামেংলংয়েরই লংপি গ্রাম থেকে। দুপুরের দিকে তিনজন বাড়ির পথে ফিরছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সেই সময় তাঁদের উপর সশস্ত্র হামলা হয়।
গুলিতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দু’জনের। তাঁদের সঙ্গে থাকা এক মহিলা এখনও নিখোঁজ। হামলাকারীরা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়।
কুকি সংগঠনের নিশানায় নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠী
পরপর হামলার পর ক্ষোভ ছড়িয়েছে কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে। কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই আক্রমণের পিছনে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে।
তবে পুলিশের তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এই অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হামলাকারীদের পরিচয়, তাঁদের উদ্দেশ্য এবং কোনও নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।
মণিপুরে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। ফলে নতুন করে কোনও হামলার ঘটনা সামনে এলেই তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের পালটা অভিযোগ শুরু হয়।
এই ঘটনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একদিকে কুকি সংগঠনগুলি নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছে, অন্যদিকে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হামলাকারীদের চিহ্নিত করাই এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিশুও রেহাই পেল না, বাড়ছে আতঙ্ক
তোলেন গ্রামের ঘটনায় ছয় বছরের শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি পরিবারের উপর হামলার সময় শিশুকেও গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
হামলার পর আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও পরিবারের দুই প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে বাঁচানো যায়নি। শিশুটির চিকিৎসা চলছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও তীব্র হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের অনেকেই নতুন করে হামলার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে রাতের দিকে চলাফেরা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় হামলায় একজন মহিলার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি কোথায় রয়েছেন, তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাঁকে খুঁজে বের করতে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা
পরপর হামলার ঘটনায় নিন্দায় সরব হয়েছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং। নিরীহ মানুষের উপর এই ধরনের হামলা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের উপর এ ধরনের কাপুরুষোচিত আক্রমণের কোনও জায়গা নেই। শান্তি বজায় রাখার জন্য সকল পক্ষের কাছে আবেদনও জানানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের তরফেও ঘটনার নিন্দা করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। হামলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
প্রশাসনের আশঙ্কা, নতুন করে রক্তপাতের ঘটনা মণিপুরের ইতিমধ্যেই নাজুক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তাই হামলার সঙ্গে যুক্তদের দ্রুত চিহ্নিত করা এবং এলাকায় উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘ব্ল্যাক ডে’-তেই হামলা, ফিরে এল পুরনো সংঘাতের স্মৃতি
ঘটনার সময়টিও কুকি সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৩ সেপ্টেম্বর কুকিদের মধ্যে ‘ব্ল্যাক ডে’ হিসেবে পালিত হয়।
১৯৯২ সালে মণিপুরে কুকি-নাগা জাতিগত সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা সেই হিংসায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই সংঘাতে নিহতদের স্মরণেই কুকি সম্প্রদায়ের একটি অংশ ১৩ সেপ্টেম্বরকে ‘ব্ল্যাক ডে’ হিসেবে পালন করে। সেই স্মরণীয় দিনের কাছাকাছি সময়েই ফের কুকি গ্রামবাসীদের উপর হামলার ঘটনা সামনে আসায় পুরনো ক্ষত নতুন করে উসকে উঠেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই ধরনের ঘটনা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আগে থেকেই থাকা অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একটি হামলার পালটা প্রতিক্রিয়া থেকে নতুন করে হিংসা ছড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তিন বছর পরও পুরোপুরি শান্ত নয় মণিপুর
২০২৩ সাল থেকে মণিপুরে জাতিগত সংঘাতের কারণে ব্যাপক হিংসা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির কিছু জায়গায় উন্নতি হলেও বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরেও বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
তামেংলংয়ের সাম্প্রতিক হামলা সেই সমস্যাকেই আবার সামনে নিয়ে এল। বিশেষ করে একই দিনে দুটি পৃথক এলাকায় প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
এখন তদন্তকারীদের সামনে একাধিক প্রশ্ন—হামলাকারীরা কারা, তাঁদের উদ্দেশ্য কী ছিল, দুই হামলার মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং নিখোঁজ মহিলার কী হয়েছে।
তদন্তেই মিলবে হামলার আসল সূত্র
হামলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি হামলাকারীদের সন্ধানেও তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগোতে পারে। বিশেষ করে দুটি হামলার মধ্যে কোনও পরিকল্পিত যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
নিখোঁজ মহিলাকে উদ্ধার করা এই মুহূর্তে প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি কোথায় রয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে দ্বিতীয় হামলার পূর্ণ চিত্রও স্পষ্ট হতে পারে।
একইসঙ্গে শিশুটির চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন করে হিংসা ছড়ানোর আশঙ্কা
মণিপুরের মতো দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত উত্তেজনায় থাকা রাজ্যে একটি প্রাণঘাতী হামলার প্রভাব শুধু ঘটনাস্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ঘটনার পর গুজব, পালটা হামলা এবং প্রতিশোধের আশঙ্কা দ্রুত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে দিতে পারে।
তামেংলংয়ের ঘটনায় সেই আশঙ্কাই নতুন করে দেখা দিয়েছে। কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ এবং নাগা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নের পাশাপাশি প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, হামলার প্রকৃত দায় কার, তা তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনও সম্প্রদায় বা সংগঠনকে দায়ী করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই মুহূর্তে তাই নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আহত শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নিখোঁজ মহিলাকে উদ্ধার করা এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি।
মণিপুরের মানুষ বহু বছর ধরে হিংসার মূল্য দিয়েছেন। রবিবারের এই হামলা যেন সেই পুরনো অধ্যায়কে ফের খুলে না দেয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।



