লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে বিতর্কে নতুন মোড়। প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে ফের হাজিরার নোটিস পাঠিয়েছে বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। এটি তাঁকে পাঠানো তৃতীয় নোটিস। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, নোটিস গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে থানায় উপস্থিত হয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে তাঁকে।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, এর আগেও দু’বার তাঁকে তলব করা হয়েছিল। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে থানায় হাজির হননি। ফলে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে আবারও নোটিস পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সমগ্র বিতর্কের সূত্রপাত গত ১৭ মে। ওই দিন মেসি-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক শতদ্রু দত্ত বিধাননগর দক্ষিণ থানায় অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে টিকিটের কালোবাজারি, প্রতারণা, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতি এবং আর্থিক অনিয়মের মতো একাধিক গুরুতর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ। এরপর থেকেই তদন্তে গতি আসে এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথমবার অরূপ বিশ্বাসকে গত ৪ জুন থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে প্রাক্তন মন্ত্রী পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওই সময়ে থানায় হাজির হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় এবং অন্তত দু’সপ্তাহ সময় প্রয়োজন।
তবে তদন্তকারীরা সেই আবেদন মঞ্জুর করেননি। তাঁদের দাবি, তদন্তে বিলম্ব ঘটানো ঠিক হবে না। তাই দ্বিতীয়বার নতুন করে তাঁকে নোটিস পাঠানো হয়।
গত ৮ জুন সকাল ১১টার মধ্যে থানায় হাজির হতে বলা হয়েছিল অরূপ বিশ্বাসকে। তার আগের দিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে দু’টি পৃথক নোটিসও টাঙিয়ে দিয়ে আসে পুলিশ। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, শারীরিক অসুস্থতার যে কারণ দেখানো হয়েছে, তার সমর্থনে কোনও মেডিক্যাল রিপোর্ট বা চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি।
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য ছিল, অসুস্থতার দাবির পক্ষে যথাযথ প্রমাণ না থাকায় হাজিরা এড়ানোর আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। সেই কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে থানায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ বহাল রাখা হয়।
কিন্তু দ্বিতীয় তলবেও সাড়া দেননি অরূপ বিশ্বাস। তিনি নিজে থানায় যাননি, এমনকি তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমেও তদন্তকারীদের কাছে কোনও নতুন তথ্য বা ব্যাখ্যা পৌঁছয়নি বলে পুলিশ সূত্রে দাবি।
এরই মধ্যে আইনি সুরক্ষার চেষ্টা করেন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী। মেসি ইভেন্ট সংক্রান্ত মামলায় তিনি প্রথমে বারাসত আদালতে আগাম জামিনের আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি। সেখানেও প্রথম পর্যায়ে তিনি স্বস্তি পাননি। যদিও পরে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালতের তরফে জানানো হয়, তাঁকে তলব করার ক্ষেত্রে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিস দিতে হবে।
একইসঙ্গে হাই কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, তদন্ত প্রক্রিয়া চলবে এবং পুলিশ প্রয়োজনীয় তদন্তমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে। তবে আদালতের অনুমতি ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের মতো কড়া ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। পাশাপাশি আদালত তাঁকে রাজ্যের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধের মধ্যে রেখেছে।
এই পরিস্থিতিতে পুলিশের তৃতীয় নোটিস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, ধারাবাহিকভাবে তলব এড়িয়ে যাওয়ায় তদন্তের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছে তদন্তকারী সংস্থা।
অন্যদিকে, অরূপ বিশ্বাসের বর্তমান অবস্থান নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। পুলিশ সূত্রে দাবি, এই মুহূর্তে তিনি কোথায় রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে কোনও গ্রেপ্তারি পদক্ষেপের অনুমতি নেই, তবু তদন্তে তাঁর উপস্থিতি প্রয়োজন বলেই মনে করছে পুলিশ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মেসিকে ঘিরে অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো উচ্চপ্রচারিত একটি ইভেন্টে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি ইতিমধ্যেই ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগের সত্যতা আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি। তবে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে।
তদন্তকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগকারীর বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের নথি এবং অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে পুরো ঘটনার একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি করা। সেই কারণেই অরূপ বিশ্বাসের জিজ্ঞাসাবাদকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন দেখার, তৃতীয় নোটিস পাওয়ার পর প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী এবার থানায় হাজির হয়ে তদন্তে সহযোগিতা করেন কি না। তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের উপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে মেসি ইভেন্ট সংক্রান্ত এই বহুচর্চিত মামলার তদন্ত কোন দিকে এগোয়।



