রাত সাড়ে ১১টায় আচমকাই আগুন
বুধবার গভীর রাতে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের জেওয়ার এলাকায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। প্রায় রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ৩৩ কিলোমিটার মাইলস্টোনের কাছে চলন্ত বাসটিতে আগুন ধরে যায়। বাসটি দিল্লির কাশ্মীরি গেট থেকে মাহোবার দিকে যাচ্ছিল।
পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাসটিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী ছিলেন। বেশিরভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ফলে আগুন লাগার প্রথম মুহূর্তে অনেকেই পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন দ্রুত গোটা বাসে ছড়িয়ে পড়ে।
আগুনের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসের ভিতর ধোঁয়ায় ভরে যায়। ঘুম থেকে উঠে অনেক যাত্রী দিশেহারা হয়ে পড়েন। একসঙ্গে বহু মানুষ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
জানলা ভেঙে ঝাঁপ, কোনওক্রমে প্রাণ বাঁচালেন যাত্রীরা
আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর বাসের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ধোঁয়ার কারণে সামনে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। ফলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি কয়েকজন যাত্রী জানলা ভেঙে বাইরে ঝাঁপ দেন।
এক যাত্রী সংবাদসংস্থা ANI-কে জানান, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। অন্য এক ব্যক্তি তাঁকে ঘুম থেকে তুলে বাসে আগুন লাগার কথা জানান। চোখ খুলতেই চারদিকে ধোঁয়া দেখতে পান তিনি। কোনওরকমে বাস থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রীকে নিরাপদে বের করে আনা হয় বলে দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে কয়েকজন যাত্রী আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়েন। পরে বাসের ভিতর থেকে ৯ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়।
আগুনের উৎস নিয়ে তদন্ত, AC-তে স্পার্কের সম্ভাবনা
অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন। তবে গ্রেটার নয়ডা পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, বাসের AC-তে স্পার্ক বা বিস্ফোরণ থেকে ইঞ্জিনের লুব্রিকেটিং অয়েলে আগুন ধরে যেতে পারে। এরপর দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।
তবে এটিকে এখনও চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। বাসের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, AC ইউনিট, ইঞ্জিন, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত অংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের আগে বাসের ভিতরে পোড়া গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল কি না, যাত্রীরা চালক বা কন্ডাক্টরকে সতর্ক করেছিলেন কি না—সেই বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
চালক ও কন্ডাক্টর গ্রেপ্তার
ঘটনার পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে চালক ও কন্ডাক্টরের গ্রেপ্তারে। পুলিশ তাঁদের হেফাজতে নিয়ে দুর্ঘটনার আগে কী হয়েছিল এবং আগুন লাগার পর তাঁরা কী পদক্ষেপ করেছিলেন, তা জানতে চাইছে।
একটি এফআইআর-ভিত্তিক রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, আগুন লাগার আগে কয়েকজন যাত্রী চালক ও কন্ডাক্টরকে বাস থেকে পোড়া গন্ধ আসার কথা জানিয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বাস থামিয়ে বিষয়টি পরীক্ষা করেননি। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
পুলিশ এখন যাত্রীদের বয়ান, বাসের অবস্থা এবং ঘটনাস্থলের অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখছে। চালক বা কন্ডাক্টরের কোনও গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ চলছে
অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন মহিলা এবং আটজন পুরুষ রয়েছেন বলে প্রাথমিক পুলিশি তথ্য জানিয়েছে। মৃতদের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
অনেক যাত্রীর পরিচয় ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া এখনও চলছিল। অগ্নিকাণ্ডে বাসের ভিতরে থাকা লাগেজ, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রীও নষ্ট হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
নিখোঁজ বা আহত যাত্রীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা
অগ্নিকাণ্ডে আহত কয়েকজন যাত্রীকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জেওয়ারের কৈলাশ হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসা হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন জানিয়েছে, আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী Yogi Adityanath দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর শোকপ্রকাশ করেন এবং নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
কেন্দ্রের তরফেও মৃত ও আহতদের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রাতের বাসে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনা ফের রাতের স্লিপার বাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় বহু যাত্রী ঘুমিয়ে থাকেন। ফলে আগুন বা অন্য কোনও বিপদ শুরু হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বিশেষ করে AC স্লিপার বাসে জানলা ও দরজা বন্ধ থাকায় আগুনের ধোঁয়া দ্রুত ভিতরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জরুরি অবস্থায় বিকল্প বেরোনোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পর্যাপ্ত রয়েছে কি না এবং চালক-কন্ডাক্টর কীভাবে পরিস্থিতি সামলান—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তদন্তে যদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনও গাফিলতি ধরা পড়ে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে পরিবহণ সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে ফের বড় বাস দুর্ঘটনা
যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথগুলির একটি। দিল্লি থেকে আগ্রা ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতে এই রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পথেই অতীতে একাধিক বড় বাস দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফলে নতুন করে বাসের অগ্নিকাণ্ড সামনে আসায় রাতের আন্তঃজেলা বাস পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে বর্তমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং দায় কার, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তদন্তে এখন নজর কোন দিকে?
পুলিশ ইতিমধ্যেই মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। বাসটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জীবিত যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে।
বাসের AC এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কী অবস্থায় ছিল, আগুনের প্রথম উৎস কোথায়, কত দ্রুত তা ছড়িয়েছিল এবং চালক-কন্ডাক্টর পরিস্থিতি সামলাতে কী পদক্ষেপ করেছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
এছাড়া বাসটির ফিটনেস, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদনও খতিয়ে দেখা হতে পারে। তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতেই দুর্ঘটনার পূর্ণ চিত্র সামনে আসবে।
এক রাতের যাত্রা বদলে দিল বহু পরিবারের জীবন
দিল্লি থেকে মাহোবার উদ্দেশে রওনা দেওয়া যাত্রীদের কাছে এটি ছিল একটি সাধারণ রাতের যাত্রা। কিন্তু জেওয়ারের কাছে কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই যাত্রা ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
অন্তত ৯ জনের মৃত্যু এবং বহু যাত্রীর আহত হওয়ার ঘটনায় একাধিক পরিবার স্বজন হারিয়েছে। অন্যদিকে, জানলা ভেঙে বা অন্যভাবে বাস থেকে বেরিয়ে আসা যাত্রীরা কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচেছেন।
এখন পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি মৃতদের পরিচয় শনাক্ত, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আহতদের চিকিৎসাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে বাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।



