মধ্যমগ্রাম রেলস্টেশনে হকার উচ্ছেদকে ঘিরে আইনি লড়াইয়ে আপাতত স্বস্তি পেলেন ব্যবসায়ীরা। কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ বহাল রাখায়, রেলের প্রস্তাবিত উচ্ছেদ অভিযান আপাতত স্থগিতই থাকছে।
এর আগে স্টেশন চত্বরে উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ১৩ জন হকার আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতে সিঙ্গল বেঞ্চ সাময়িকভাবে উচ্ছেদে স্থগিতাদেশ দেয়। পরে ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করে রেল কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, আপাতত সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশে কোনও পরিবর্তন করা হচ্ছে না। আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে, এই অন্তর্বর্তী সুরক্ষা শুধু মামলাকারী ১৩ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যমগ্রাম স্টেশনের সংশ্লিষ্ট সকল হকারের ক্ষেত্রেই তা কার্যকর বলে গণ্য হবে।
শুনানির সময় রেলের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী যুক্তি দেন, হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আলাদা করে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি হকার সংগঠন বা ইউনিয়নের পক্ষে এই ধরনের মামলা করা আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না।
তবে আদালত সেই যুক্তি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলে। বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য জানতে চান, যদি রেল ইতিমধ্যেই নোটিশ জারি করে থাকে, তাহলে সেই নোটিশে কোন কোন কাঠামোকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি কেন।
আদালত আরও জানতে চায়, লাইসেন্সধারী ও লাইসেন্সবিহীন ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোনও পৃথক তালিকা তৈরি করা হয়েছে কি না। পাশাপাশি অস্থায়ী ও স্থায়ী কাঠামোর মধ্যে কোনও পার্থক্য করা হয়েছে কি না, সেটিও আদালতের নজরে আসে। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ছিল, এই ধরনের মৌলিক তথ্য স্পষ্ট না থাকলে নোটিশের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
রেলের তরফে আরও দাবি করা হয়, যদি আদালত সুরক্ষা দিতেই চায়, তবে তা কেবলমাত্র যাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সকল হকারকে একই নির্দেশের আওতায় আনা সম্ভব নয় বলেও যুক্তি দেওয়া হয়।
এর জবাবে আদালত মন্তব্য করে, যদি রেল প্রত্যেক হকারকে পৃথকভাবে নোটিশ না দিয়ে একসঙ্গে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী সুরক্ষাও একইভাবে সংশ্লিষ্ট সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, হকারদের পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, হকারদের বিষয়টি কেবল সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্ন নয়। তাঁদের মূল অধিকার জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে যুক্ত। তাই উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
গত কয়েক মাসে শিয়ালদহ, দমদম, যাদবপুর-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে রেল। নিরাপত্তা, যাত্রী চলাচলের সুবিধা এবং অবৈধ দখলমুক্ত করার স্বার্থে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে রেলের দাবি। তবে বিভিন্ন জায়গায় হকার সংগঠনগুলির তরফে অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নোটিশ বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
মধ্যমগ্রামের মামলাও সেই বৃহত্তর বিতর্কেরই অংশ হিসেবে উঠে এসেছে। আদালত এখন মূলত জানতে চাইছে, উচ্ছেদ অভিযানে আইনি বিধি এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতিগুলি যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না।
ডিভিশন বেঞ্চের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশের ফলে আপাতত মধ্যমগ্রাম স্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিতই থাকবে। পরবর্তী শুনানিতে রেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ জারি, লাইসেন্সের অবস্থা, কাঠামোর শ্রেণিবিন্যাস এবং উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বৈধতা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে। সেই শুনানির পরই মামলার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ স্পষ্ট হবে।



