মাঝআকাশে বিপদের মুখে পড়েও দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে আসেননি ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর। নিজের উপর ভয়াবহ হামলার পরেও বিমানের যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। এবার তাঁর সেই সাহসিকতার স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগী হয়েছে ইজরায়েল। দেশের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজোগ জানিয়েছেন, স্মিত মচ্ছরকে ‘Presidential Award for Civil Heroism’ সম্মানে ভূষিত করা হবে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন থাকায় সুস্থ হওয়ার পর তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল Flydubai-র একটি বিমানে। প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় বিমানটি যখন আকাশে উড়ছিল, তখন ককপিটের ভিতরে আচমকাই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ, সহ-পাইলটের ছুরির আঘাতে গুরুতর জখম হন ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। বিমানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশে এমন হামলা শুধু পাইলটের জীবনকেই বিপন্ন করেনি, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও বড়সড় আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
তবে বিমানে থাকা অন্য কয়েকজনের দ্রুত পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কেউ বিপদের সংকেত দেন, কেউ আহত পাইলটের চিকিৎসায় এগিয়ে আসেন, আবার কেউ অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। এই সম্মিলিত তৎপরতার ফলে সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছয় বীরকে সম্মান জানাল ইজরায়েল
বৃহস্পতিবার জেরুজালেমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ছয়জনকে ‘Presidential Award for Civil Heroism’ সম্মান প্রদান করেন ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজোগ। Flydubai-র ওই বিমানে বিপদের সময়ে যাঁরা সক্রিয়ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের সাহসিকতাকে স্বীকৃতি জানাতেই এই উদ্যোগ।
বিমানে সঙ্কটের মুহূর্তে প্রত্যেকের ভূমিকা ছিল আলাদা। বিপদের অ্যালার্ম বাজিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা, আহত পাইলটের শারীরিক অবস্থা সামলানোর চেষ্টা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটকানোর মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁরা বিপর্যয় মোকাবিলায় সহযোগিতা করেন। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে অন্যদের পাশে দাঁড়ানোই তাঁদের এই সম্মানের যোগ্য করে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট হেরজোগ ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ইজরায়েলের বীরদের সম্মানিত করার এই বিশেষ মুহূর্তে তাঁরা ভারতীয় পাইলটের প্রতিও শুভেচ্ছা জানাতে চান। তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে হেরজোগ বলেন, মচ্ছরের সাহসিকতা বড়সড় বিপর্যয় এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
এই ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, স্মিত মচ্ছরের অবদানকে শুধু বিমান সংস্থার কর্মী হিসেবে নয়, বিপদের মুখে মানুষের জীবন রক্ষায় অসাধারণ সাহস দেখানো একজন ব্যক্তি হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে চাইছে ইজরায়েল।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্মিত, স্থিতিশীল শারীরিক অবস্থা
বর্তমানে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর আবু ধাবির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসা চলছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আপাতত তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে কত দিন লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, স্মিত সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁর হাতে সম্মানটি তুলে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, জেরুজালেমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্য ছয়জনকে পুরস্কৃত করা হলেও ভারতীয় পাইলটের জন্যও একই সম্মান বরাদ্দ করা হয়েছে।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ককপিটের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমানের পরিচালনা, যাত্রীদের সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পাইলটদের উপর থাকে। সেই জায়গায় কোনও পাইলট নিজেই হামলার শিকার হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতা এবং বিমানের অন্য কর্মীদের তৎপরতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এই ঘটনার সমস্ত পরিস্থিতি, হামলার উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে অনুমান না করে আহত পাইলটের সাহসিকতা এবং উদ্ধারপ্রচেষ্টার দিকটিই আপাতত গুরুত্ব পাচ্ছে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা, স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ আমন্ত্রণ
স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতার কথা পৌঁছেছে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছেও। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ইতিমধ্যেই ভারতীয় পাইলটের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সেই কথোপকথনে তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করার পাশাপাশি ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মশাল প্রজ্জ্বলনের জন্য স্মিতকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দায়িত্ব ও সম্মান সাধারণত ইজরায়েলের নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু স্মিতের অসাধারণ সাহসিকতার কথা বিবেচনা করে তাঁকে সেই অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাতে আগ্রহী ইজরায়েল।
ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মশাল প্রজ্জ্বলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেশের ইতিহাস, জাতীয় গৌরব এবং উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মান জানানোর সঙ্গে এই আয়োজন যুক্ত। সেই অনুষ্ঠানে একজন ভারতীয় পাইলটকে আমন্ত্রণ জানানো তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু শুধু স্মিত মচ্ছরকেই নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও আগামী বছরের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আগামী বছর ইজরায়েলের এই বিশেষ আয়োজনে দুই দেশের প্রতিনিধিত্ব ও উপস্থিতি ঘিরেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সাহসিকতার স্বীকৃতি, দুই দেশের সম্পর্কেও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা
স্মিত মচ্ছরের ঘটনাটি ফের সামনে এনেছে জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানকর্মীদের দায়িত্ব ও পেশাগত সাহসিকতার গুরুত্ব। বিমান আকাশে থাকার সময় কোনও সঙ্কট তৈরি হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। সেই অবস্থায় পাইলট ও ক্রু সদস্যদের সমন্বয় যাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় আহত পাইলটের পাশাপাশি অন্য যাঁরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদেরও সম্মান জানিয়েছে ইজরায়েল। ছয়জনকে পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি স্মিত মচ্ছরের জন্য একই সম্মান ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বিপদের সময়ে অন্যের জীবন রক্ষায় ব্যক্তিগত ঝুঁকি নেওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতীয় পাইলটের প্রতি ইজরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই স্বীকৃতি মানবিক সাহসিকতার আন্তর্জাতিক গুরুত্বকেও তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিশেষ আমন্ত্রণ আগামী বছরের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
এখন স্মিত মচ্ছরের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার দিকেই নজর রয়েছে। চিকিৎসা শেষ করে তিনি কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন, তা সময়ই বলবে। তবে ইজরায়েলের সর্বোচ্চ নাগরিক সাহসিকতা সম্মানের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা ইতিমধ্যেই তাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
মাঝআকাশের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তাঁর সুস্থতা কামনা করছেন বহু মানুষ। আর ইজরায়েলের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিপদের মুখে দায়িত্ব পালন, সাহসিকতা এবং অন্যের জীবন রক্ষার প্রচেষ্টাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হল।



