পুলিশি হেফাজতের প্রথম রাতেই বদলে গেল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনের অভ্যস্ত ছন্দ। প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহকে রাত কাটাতে হয়েছে থানার লকআপে। বিলাসবহুল জীবনযাপন বা রাজনৈতিক ব্যস্ততার বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে কাটানো সেই রাত তাঁর জন্য সহজ ছিল না বলেই পুলিশ সূত্রে খবর।
জানা গিয়েছে, লকআপে কোনও বিশেষ সুবিধা বা অতিরিক্ত দাবি জানাননি তিনি। রাতের খাবার হিসেবে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ডাল ও রুটি। সেই খাবার খেয়েই রাত কাটান প্রাক্তন মন্ত্রী। তবে লকআপের সীমিত পরিসর, মেঝেতে বসে বা শুয়ে থাকার পরিস্থিতি এবং বন্দিদশার পরিবেশ তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল বলে জানা যাচ্ছে। গভীর রাত পর্যন্ত ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারেননি তিনি। ভোরের আলো ফুটতেই লকআপের মধ্যেই পায়চারি শুরু করেন।
এদিকে উদয়ন গুহকে ঘিরে বিতর্কের পরিধি আরও বাড়িয়েছে নতুন অভিযোগ। শুক্রবার দিনহাটার বাসিন্দা বিজয় সাহা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে দাবি করেন, আবাস যোজনার অধীনে ঘর পাওয়ার পরে তাঁর কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। যদিও তাঁকে মাত্র ২০ হাজার টাকার রসিদ দেওয়া হয়। এতদিন বিভিন্ন কারণে অভিযোগ জানাতে সাহস পাননি বলে দাবি করেছেন তিনি। পরিস্থিতি বদলানোর পর অবশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
শুধু একজন নন, আরও বহু মানুষের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। সিপিএমের পক্ষ থেকে অন্তত ৫৫ জনের একটি তালিকা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য দিনহাটা থানায় জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, দিনহাটা পুরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন আবাস যোজনার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে বহু মানুষের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সিপিএম নেতা শুভ্রালোক দাস জানিয়েছেন, তাঁদের হাতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যেক অভিযোগকারীর নাম, অভিযোগের ধরন এবং আর্থিক লেনদেনের বিবরণ পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রত্যেক ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং যদি অনিয়মের প্রমাণ মেলে, তবে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এই অভিযোগগুলির ফলে উদয়ন গুহের আইনি লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ায় তদন্তের পরিধিও বাড়ছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি তাঁরা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাঁরা সামনে এসে নিজেদের বক্তব্য জানাতে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে, প্রাক্তন মন্ত্রীর গ্রেপ্তারির পর দিনহাটার রাজনৈতিক পরিবেশও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এদিন উদয়ন গুহের স্ত্রী শাশ্বতী গুহ এবং পরিবারের কয়েকজন সদস্য দিনহাটার বাড়িতে পৌঁছন। যদিও সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁরা কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরেছেন, এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিজেপির বিক্ষুব্ধ নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত উদয়ন গুহের বাড়িতে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেন বলে জানা যায়। এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে দলের একাংশের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
দীপ্তিমান সেনগুপ্ত দাবি করেছেন, তাঁর এই পদক্ষেপের জেরে ক্ষুব্ধ কিছু বিজেপি কর্মী ও সমর্থক তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। অভিযোগ, তাঁর উদ্দেশে ডিম ছোড়া হয় এবং বাড়িতে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাও ভেঙে দেওয়া হয়। তিনি এই ঘটনার জন্য বিজেপির একাংশকেই দায়ী করেছেন। যদিও বিজেপি নেতৃত্ব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে এবং ঘটনার সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই বলে জানিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, উদয়ন গুহকে ঘিরে পরিস্থিতি এখন শুধুমাত্র একটি দুর্নীতির মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, পুরনো বিরোধ এবং নানা অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগের পালা।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, নিরাপত্তার কারণেই উদয়ন গুহকে বারবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে থানার মধ্যেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাক্তন মন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা যাতে কোনওভাবে অবনতি না হয়, সেই বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অভিযোগকারীদের বয়ান সংগ্রহ এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা। আবাস যোজনার নামে আদৌ কোনও বেআইনি অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে সেই অর্থ কোথায় গিয়েছে এবং কারা তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত এগোচ্ছে।
একদিকে পুলিশি হেফাজতে প্রাক্তন মন্ত্রীর প্রথম রাত, অন্যদিকে নতুন নতুন অভিযোগের আবির্ভাব— সব মিলিয়ে দিনহাটা এবং রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে উদয়ন গুহকে কেন্দ্র করে বিতর্কের পারদ ক্রমশই চড়ছে। আগামী দিনে তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের।



