কেন ফের কড়া হচ্ছে পাকিস্তান?
পাকিস্তান সরকারের এই সিদ্ধান্তের পিছনে মূল কারণ করোনা সংক্রমণ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া সামরিক উত্তেজনা এবং তার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা থেকেই এই পদক্ষেপ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী Shehbaz Sharif-এর অনুমোদনে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে নতুন করে austerity এবং fuel conservation campaign শুরু হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়ামের দাম বাড়ায় দেশের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই জ্বালানি ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সরকারি খরচেও লাগাম টানার প্রয়োজন হয়েছে।
অর্থাৎ, ‘লকডাউন’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটি কোভিডের সময়কার মতো সম্পূর্ণ জনজীবন বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। বরং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করা এবং সরকারি ক্ষেত্রে জ্বালানি ও ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে এই বিধিনিষেধ আনা হয়েছে।
সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ অর্ধেক
নতুন নির্দেশিকার অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হল সরকারি গাড়ির জন্য জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া। এই ব্যবস্থা আপাতত তিন মাসের জন্য কার্যকর থাকবে।
তবে সব ধরনের সরকারি গাড়ি এই নিয়মের আওতায় পড়ছে না। সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং জরুরি পরিষেবায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট গাড়িগুলিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ও non-operational গাড়ির ক্ষেত্রে জ্বালানি বরাদ্দ কমানোর নির্দেশ কার্যকর হবে।
এছাড়াও নতুন করে সরকারি গাড়ি কেনার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। IT সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়া অন্যান্য durable goods কেনাকাটাতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলিকে অবশ্য এই বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে।
তিন মাস বন্ধ সরকারি বিদেশযাত্রা
সরকারি খরচ কমানোর অংশ হিসেবে মন্ত্রী, আধিকারিক এবং অন্যান্য সরকারি কর্মীদের বিদেশ সফরের উপর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের scholarship, Economic Affairs Division-এর মাধ্যমে আয়োজিত training বা course এবং নির্দিষ্ট institutional agreement-এর আওতায় থাকা কর্মসূচি এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
একান্ত প্রয়োজনীয় বিদেশ সফর করতে হলে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, বিশেষ সহকারী, সাংসদ এবং সরকারি আধিকারিকদের economy class-এ ভ্রমণ করতে হবে।
বিদেশ সফরের প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের Ambassador বা High Commissioner-এর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টিও নির্দেশিকায় রাখা হয়েছে।
রাত ৯টার পর বাজার বন্ধ
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির নির্দিষ্ট closing time।
নতুন নির্দেশ অনুযায়ী দোকান, বাজার, shopping mall, bazaar, departmental store, grocery store, general store এবং kiryana shop রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
বিয়ের হল, marquee এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানস্থল রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। আর restaurant, café, eateries ও food outlets রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
তবে takeaway এবং home delivery পরিষেবা এই সময়সীমার বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পাচ্ছে।
বিয়েতে থাকবে মাত্র এক পদ!
জ্বালানি ও অর্থ সাশ্রয়ের এই অভিযানে পাকিস্তানের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিও বাদ যায়নি। বিয়ে এবং অন্যান্য marriage-related function-এ খাবারের ক্ষেত্রে single-dish policy চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থাৎ বড়সড় বিয়ের অনুষ্ঠানে একাধিক খাবারের পদ পরিবেশনের বদলে একটি নির্দিষ্ট dish রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো।
এর পাশাপাশি সরকারি আয়োজনে official dinner-এর উপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিদেশি প্রতিনিধিদলের সম্মানে প্রয়োজনীয় dinner অবশ্য এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।
কোন কোন পরিষেবা বিধিনিষেধের বাইরে?
সব পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে না। অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলিকে নির্দিষ্ট সময়ের বিধিনিষেধ থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
Pharmacy, medical store, hospital, clinic, medical laboratory এবং medical supply-এর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি এই ছাড় পাবে। এছাড়াও bakery, tandoor, milk ও dairy shop, petrol pump, CNG station এবং electric vehicle charging station-ও নির্দিষ্ট closing time-এর বাইরে থাকবে।
Gym, sports facility, sports ও padel court-এর পাশাপাশি IT company এবং call centre-ও এই সময়সীমার বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেয়েছে।
ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা ও জরুরি ক্ষেত্রগুলি সচল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকারি অনুষ্ঠানেও কাটছাঁট
নতুন austerity package-এ শুধু জ্বালানি নয়, সরকারি অনুষ্ঠান এবং প্রশাসনিক কাজেও খরচ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি অর্থে আয়োজিত seminar, training programme এবং conference যতটা সম্ভব বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন হলে সরকারি auditorium, committee room বা অন্যান্য government-owned venue ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
সরকারি বৈঠকের ক্ষেত্রেও video conference বা teleconference ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে চলতি অর্থবর্ষে non-employee-related expenditure-এ প্রতি মাসে ৫ শতাংশ করে কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, প্রশাসনিক খরচ কমিয়ে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে সরকারের উপর চাপ কমানো।
এর আগে মার্চেও হয়েছিল এমন পদক্ষেপ
এ ধরনের austerity campaign পাকিস্তানে এই প্রথম নয়। চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপের পর ইসলামাবাদ একই ধরনের একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তখন সরকারি গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার কমানো, সরকারি কর্মীদের work from home, স্কুল বন্ধ রাখা এবং বিদেশ সফরে বিধিনিষেধের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরে জুনে বেশিরভাগ fuel conservation measures প্রত্যাহার করা হলেও বাজার, shopping mall, wedding hall এবং restaurant-এর closing time সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ বহাল ছিল।
এবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ফের চাপ তৈরি হওয়ায় ইসলামাবাদ আরও বিস্তৃত austerity measures ফিরিয়ে আনল।
কতদিন চলবে এই ‘স্মার্ট লকডাউন’?
সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ কমানো এবং বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞার মতো কয়েকটি ব্যবস্থা তিন মাসের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির closing time এবং কিছু অন্যান্য austerity measures কতদিন একইভাবে চলবে, তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করতে পারে।
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, fuel conservation ও austerity measures বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কমিটি নিয়মিত রিপোর্ট সংগ্রহ করবে। কোথাও নির্দেশিকা মানা হচ্ছে না কি না, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও তাদের দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত case-by-case ভিত্তিতে নেওয়া হবে।
সংকটের প্রভাব কতটা কমবে?
পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি ব্যবহার এবং সরকারি ব্যয় কমানো। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চস্তরে থাকে, তাহলে দেশের আমদানি খরচ এবং মুদ্রাস্ফীতির উপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সেই পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি ব্যবহারে কাটছাঁট করে অর্থনীতির উপর চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ।
তবে বাজার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের closing time কমিয়ে দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং ব্যবসার উপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে জ্বালানি বাজারের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে সরকারের এই বিধিনিষেধ পরবর্তী সময়ে আরও বাড়ানো বা শিথিল করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানে ফের শুরু হয়েছে কড়া austerity drive। এটি করোনা-পরিস্থিতির মতো স্বাস্থ্যজনিত lockdown নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি দামের চাপ এবং সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে পদক্ষেপগুলি। আগামী তিন মাসে এই ব্যবস্থার ফলে পাকিস্তানের জ্বালানি ব্যবহার ও সরকারি ব্যয়ের উপর কতটা প্রভাব পড়ে, এখন নজর সেদিকেই।



