ভেটেরিনারি অফিসার নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ
কর্নাটকে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজ্যের ভেটেরিনারি অফিসার পদে নিয়োগের পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর তদন্ত শুরু করে কর্নাটক সিআইডি।
এই মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছে আইএএস আধিকারিক জ্ঞানেন্দ্রকুমার গাঙ্গোয়ারের। বর্তমানে তিনি কর্নাটকের শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংক্রান্ত শীর্ষ পদে কর্মরত। অভিযোগ ওঠা ভেটেরিনারি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার সময় তিনি কন্ট্রোলারের দায়িত্বে ছিলেন।
ফলে পরীক্ষার আয়োজন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, কোনও অনিয়ম তাঁর নজরে এসেছিল কি না এবং দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
বারবার নোটিস, তারপর CID-এর হেফাজতে IAS
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, মামলার তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য জ্ঞানেন্দ্রকুমারকে একাধিকবার নোটিস পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হয়ে তদন্তকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অনীহা দেখাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ।
তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগেই শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার তাঁকে আটক করে সিআইডি। এরপর থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা মূলত জানতে চাইছেন, ভেটেরিনারি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষায় কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল এবং সেই অনিয়মের সঙ্গে পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের কোনও যোগসূত্র ছিল কি না। পরীক্ষার প্রক্রিয়া, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি জ্ঞানেন্দ্রর বক্তব্যও যাচাই করা হচ্ছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। সিআইডির তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার উপরই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
কোথা থেকে শুরু এই তদন্ত?
জানা গিয়েছে, ভেটেরিনারি অফিসার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে প্রথমে কর্নাটকের বিধান সৌধ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৮ জুলাই মামলাটির তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তদন্তভার পাওয়ার পরই সিআইডি নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করে। পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা আধিকারিক, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়।
তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই জ্ঞানেন্দ্রকুমার গাঙ্গোয়ারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। তিনি পরীক্ষার কন্ট্রোলার হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
ED-এর তল্লাশিতে বেঙ্গালুরু থেকে বরেলি
শুধু সিআইডি নয়, একই মামলার আর্থিক দিকও খতিয়ে দেখছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। গত ২৩ আগস্ট তদন্তের অংশ হিসেবে জ্ঞানেন্দ্রকুমারের বেঙ্গালুরুর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়।
এর পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের বরেলিতে তাঁর বাড়িতেও পৌঁছন ইডি আধিকারিকরা। একই দিনে দুই জায়গায় তল্লাশি চালানোর ঘটনায় তদন্তের পরিধি যে শুধু নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা স্পষ্ট।
তদন্তকারীরা আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তি সংক্রান্ত নথি, ব্যাংকিং তথ্য এবং মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখছেন বলে জানা গিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে কোনও বেআইনি আর্থিক লেনদেনের যোগ রয়েছে কি না, সেটিই ইডির তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে।
CID ও ED কি আলাদা দিক খতিয়ে দেখছে?
এই ঘটনায় দুই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সিআইডি মূলত নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রক্রিয়াগত গাফিলতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে।
অন্যদিকে, ইডির নজর মূলত সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের দিকে। নিয়োগ দুর্নীতির মাধ্যমে কোনও অর্থ লেনদেন হয়েছিল কি না, বেআইনি সম্পত্তি তৈরি বা অর্থ পাচারের মতো কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেই দিকও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
সিআইডি ও ইডির তদন্তে পাওয়া তথ্য একে অপরকে কতটা সমর্থন করে, সেটিও পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন আইএএস আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ায় এই মামলাটি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থায় পরীক্ষার্থীদের আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নপত্র, পরীক্ষার ফল, মেধাতালিকা বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনও পর্যায়ে অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যতের উপর পড়ে।
এই মামলায় তাই শুধু অভিযুক্ত আধিকারিকের ভূমিকা নয়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটিই তদন্তের আওতায় আসতে পারে। পরীক্ষার আগে ও পরে কী কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং কারা সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
সামনে আরও নাম উঠে আসবে?
জ্ঞানেন্দ্রকুমারকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্ত কোন দিকে যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অন্য কোনও আধিকারিক বা ব্যক্তির নাম সামনে আসে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।
তদন্তকারীরা পরীক্ষার নথি, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে তাঁর বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন। কোনও অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সেই সূত্র ধরে তদন্ত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
একইভাবে ইডির তল্লাশিতে পাওয়া নথি বা তথ্যও তদন্তের গতিপথ বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেনের কোনও সূত্র পাওয়া গেলে মামলাটি আরও বড় আকার নিতে পারে।
এখন নজর তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপে
এই মুহূর্তে কর্নাটক PSC-এর ভেটেরিনারি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে তদন্ত চলছে দুই দিক থেকে। একদিকে সিআইডি জ্ঞানেন্দ্রকুমার গাঙ্গোয়ারকে হেফাজতে রেখে তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখছে, অন্যদিকে ইডি সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের সূত্র অনুসন্ধান করছে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হয় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও কারও ভূমিকা সামনে আসে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং তাঁর দুই বাড়িতে ইডির তল্লাশি কর্নাটকের সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আগামী দিনে সিআইডির তদন্ত এবং ইডির অনুসন্ধান থেকে কী তথ্য সামনে আসে, তার উপরই এই মামলার পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।



