রাজ্যের একের পর এক নির্মাণজনিত বিপর্যয় প্রশাসনের নজরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গার্ডেনরিচ এবং তারাতলার সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর এবার রাজ্য সরকার নগর উন্নয়ন নীতিতে বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটল। আপাতত কলকাতা, বিধাননগর এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নতুন জি+৫ স্তরের বাণিজ্যিক বহুতল নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে।
শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান, নগরায়ণ থামানো সরকারের উদ্দেশ্য নয়, বরং নির্মাণের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। তাঁর কথায়, “জীবনের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনওভাবেই গাফিলতি সহ্য করা হবে না।”
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত মূলত কয়েকটি বড় নগরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুর এলাকা ছাড়াও বিধাননগর, রাজারহাট, নিউটাউন, পূজালি, বারুইপুর, মহেশতলা, রাজপুর-সোনারপুর, দক্ষিণ দমদম, কামারহাটি, বরানগর এবং বালির মতো এলাকায় আপাতত নতুন নির্মাণ প্রকল্পে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
এই নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নতুন জি+৫ বাণিজ্যিক নির্মাণ কার্যত বন্ধ থাকবে। তবে আবাসিক বাড়ির সাধারণ সংস্কার বা ছোটখাটো নির্মাণ কাজ এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি ১১ সদস্যের অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা চলমান এবং অনুমোদিত বহুতল প্রকল্পগুলির প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত দিক যাচাই করবে। কমিটির দায়িত্ব হবে প্রতিটি প্রকল্পের নকশা, নিরাপত্তা মান, নির্মাণ উপকরণের গুণমান এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখা।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই অডিট কমিটি প্রথম পর্যায়ে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেবে আগামী ৭ দিনের মধ্যে। এরপর বিস্তারিত তদন্ত চালিয়ে ৯০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করতে হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে প্রশাসন।
সরকার আরও জানিয়েছে, যেখানে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়বে, সেখানে সংশ্লিষ্ট বিল্ডিং প্ল্যান বাতিল করা হতে পারে। অন্যদিকে ছোটখাটো ত্রুটির ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে নির্মাণ সংস্থাগুলিকে।
নির্মাণ খাতে এই কঠোর পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলির প্রভাব। তারাতলা ও গার্ডেনরিচ এলাকায় নির্মীয়মাণ কাঠামো ধসে প্রাণহানির ঘটনা প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনার ত্রুটি, তদারকির অভাব এবং নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন নীতির মাধ্যমে রাজ্য সরকার চাইছে নগরায়ণের গতি বজায় রেখেই নিরাপত্তার মান আরও কঠোর করা।
শুভেন্দু অধিকারী এদিন আরও জানান, সরকারের উদ্দেশ্য শহর উন্নয়ন থামানো নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, “নগরায়ণ প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে জীবনহানির ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।”
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এই নিষেধাজ্ঞা আপাতত এক মাসের জন্য কার্যকর থাকবে। ওই সময়ের মধ্যে অডিট কমিটির প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। এরপর ১ আগস্ট থেকে নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত নির্মাণ শিল্পে স্বল্পমেয়াদে ধাক্কা দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি নিরাপত্তা মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে বহুতল নির্মাণে নিয়মভঙ্গ রোধে এই পদক্ষেপ একটি ‘কড়া বার্তা’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এছাড়া, প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে এই নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র বাণিজ্যিক বহুতল প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যক্তিগত আবাসিক নির্মাণ, মেরামতি বা ছোট প্রকল্পে সাধারণ নিয়ম বহাল থাকবে।
রাজ্যের নগর উন্নয়ন দফতরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, অডিট কমিটি শুধু কাগজপত্র নয়, বাস্তব নির্মাণস্থল পরিদর্শনও করবে। প্রয়োজনে নির্মাণ সামগ্রী পরীক্ষা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং রিপোর্ট যাচাই করা হবে।
একইসঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সংক্রান্ত নিরাপত্তা মানও খতিয়ে দেখা হবে। ভবিষ্যতে কোনও বহুতল প্রকল্প অনুমোদনের আগে এই সব দিক বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করা হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজ্যের নির্মাণ নীতিতে এটি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তা প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রেক্ষিতে সরকার এখন আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
নগরায়ণের গতির সঙ্গে নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



