মন্দির থেকে পার্কে, তারপরই বিপদ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ ১৭ বছরের কিশোরী তার এক বন্ধুর সঙ্গে কালকাজি মন্দিরে গিয়েছিল। পুজো দেওয়ার পর প্রায় সাড়ে ৭টা নাগাদ তারা কাছের আস্থা কুঞ্জ পার্কে যায়।
সেখানেই তিন যুবক তাদের কাছে আসে বলে অভিযোগ। নিজেদের পুলিশকর্মী পরিচয় দিয়ে ওই তিনজন কিশোরী ও তার বন্ধুকে ভয় দেখায়। পুলিশি পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এরপর কিশোরীর বন্ধুকে আটকে রেখে তাকে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে পুলিশকে দেওয়া বয়ানে অভিযোগ উঠেছে। তিন অভিযুক্তের বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
রাতেই পুলিশকে খবর
ঘটনার পর কিশোরী ও তার বন্ধু কোনওভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে পুলিশের কাছে খবর দেন। রাত ৮টা ৪৫ মিনিট নাগাদ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন আসে বলে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে।
খবর পেয়েই আমর কলোনি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। কিশোরীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য AIIMS-এ নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁর বয়ান রেকর্ড করা হয় এবং চিকিৎসা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
পুলিশের অভিযোগের ভিত্তিতে POCSO আইনের পাশাপাশি গণধর্ষণ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে।
CCTV ফুটেজেই মিলল অভিযুক্তদের সূত্র
ঘটনার পর তদন্তে নেমে পুলিশ আস্থা কুঞ্জ পার্ক এবং আশপাশের এলাকার CCTV ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে। ঘটনাস্থলের আশপাশে উপস্থিত ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্তকারীরা কিশোরী ও তার বন্ধুর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে CCTV ফুটেজ মিলিয়ে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমেও তাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এই তদন্তের ভিত্তিতেই এক অভিযুক্তের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ জানতে পারে বলে জানা গিয়েছে। এরপর মঙ্গলবার সকালে তাকে ধরতে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি, পালটা জবাব
এক অভিযুক্তকে আটক করতে গিয়ে মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দিল্লি পুলিশের দাবি, আমর কলোনির DM Office Road-এর কাছে অভিযুক্তকে থামানোর চেষ্টা করা হলে সে পুলিশকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত তিন রাউন্ড গুলি চালায়। পালটা গুলির লড়াইয়ে সে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করে চিকিৎসার জন্য AIIMS Trauma Centre-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম আসিফ বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে আগের কোনও অপরাধের রেকর্ড রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাকি দুই অভিযুক্তের খোঁজ
এই ঘটনায় এখনও দু’জন অভিযুক্ত পলাতক। তাঁদের সন্ধানে একাধিক পুলিশ দল কাজ করছে।
পুলিশের তরফে পার্ক এবং আশপাশের এলাকার আরও CCTV ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল ও যোগাযোগের সূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা কিশোরীর বয়ান, তাঁর বন্ধুর বক্তব্য, CCTV ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করছেন। গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তের কাছ থেকেও বাকি দু’জন সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুলিশ পরিচয় ব্যবহার করল কীভাবে?
এই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে অভিযুক্তদের ভুয়ো পুলিশ পরিচয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজেদের পুলিশকর্মী বলে পরিচয় দেওয়ার কারণেই কিশোরী ও তাঁর বন্ধু প্রথমে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি।
তদন্তকারীদের সামনে এখন প্রশ্ন, অভিযুক্তরা কীভাবে নিজেদের পুলিশ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। তারা কোনও পরিচয়পত্র, পোশাক বা অন্য কোনও পুলিশ-সদৃশ সামগ্রী ব্যবহার করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও একটি প্রশ্ন হল, অভিযুক্তদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র এল কীভাবে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস এবং সেটি বৈধভাবে তার কাছে ছিল কি না, সেই বিষয়েও তদন্ত হতে পারে।
কালকাজি এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
আস্থা কুঞ্জ পার্ক কালকাজি মন্দিরের কাছেই অবস্থিত। ঘটনাটি সন্ধ্যার সময়ে ঘটেছে বলে অভিযোগ। ফলে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টহলদারি এবং CCTV নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই পার্ক ও সংলগ্ন এলাকার ফুটেজ পরীক্ষা করছে। ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ছিল কি না, পুলিশি টহল কতটা সক্রিয় ছিল এবং অভিযুক্তরা কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনও নির্দিষ্ট ঘাটতিকে এই ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
দিল্লিতে পরপর নাবালিকা নির্যাতনের ঘটনা
কালকাজির এই ঘটনা এমন সময়ে সামনে এল, যখন দিল্লিতে নাবালিকাদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে চলতি মাসেই দিল্লির স্বরূপনগর এলাকায় ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ সামনে এসেছিল। সেই ঘটনায় তিন নাবালক-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনের আরও অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে শিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের জন্য জনপরিসরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তদন্তের সামনে একাধিক প্রশ্ন
এই মামলায় এখন পুলিশের সামনে একাধিক প্রশ্ন। তিন অভিযুক্তের পরিচয় কী, তাদের মধ্যে আগে থেকেই কোনও যোগাযোগ ছিল কি না, কেন তারা পুলিশ পরিচয় ব্যবহার করেছিল এবং অস্ত্রটি কোথা থেকে পেয়েছিল—এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাশাপাশি, ঘটনাস্থলে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল কি না এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনও সংগঠিত অপরাধচক্রের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তাও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।
গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফরেনসিক ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের পর তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
POCSO আইনে তদন্ত
নাবালিকা হওয়ায় এই মামলায় Protection of Children from Sexual Offences বা POCSO Act-এর বিধান প্রযোজ্য হয়েছে। তদন্তকারীরা কিশোরীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী তাঁর বয়ান এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। একজন গ্রেপ্তার হলেও আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। বাকি দুই অভিযুক্তের গ্রেপ্তার এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণের উপরই মামলার পরবর্তী আইনি অবস্থান নির্ভর করবে।
সামনে কী?
এই মুহূর্তে পুলিশের প্রধান লক্ষ্য পলাতক দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা এবং ঘটনার সম্পূর্ণ ক্রম পুনর্গঠন করা। একইসঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আসিফের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অন্য দুই অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করতে কতটা সাহায্য করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
CCTV ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য এবং অভিযুক্তদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভাব্য প্রমাণ একত্র করে তদন্ত এগোবে।
সব মিলিয়ে, কালকাজি মন্দিরের কাছে নাবালিকার উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের তদন্তে ইতিমধ্যেই একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্ত গুলি চালায় এবং পালটা গুলিতে আহত হওয়ার পর তাকে ধরা হয়। এখন বাকি দুই অভিযুক্তের সন্ধানের পাশাপাশি ভুয়ো পুলিশ পরিচয় ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের পিছনের তথ্যও খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।



