প্রত্যাশার চেয়ে বেশি জিডিপি বৃদ্ধি
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এপ্রিল থেকে জুন—প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন পূর্বাভাসে প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় ৭.১ শতাংশ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল।
সরকারের কাছে এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কারণ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত এবং বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেই ভারতের এই বৃদ্ধির হার সামনে এসেছে।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণও জিডিপির এই পরিসংখ্যানকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে তুলে ধরেছেন। পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পরই কেন্দ্রের তরফে ভারতের অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরা শুরু হয়।
এই আবহেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
‘ঝুট কি গুঞ্জ’ দিয়ে বিরোধীদের নিশানা
ভিডিও বার্তায় মোদি সরাসরি কোনও বিরোধী নেতার নাম না নিলেও তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক আক্রমণের সুর স্পষ্ট ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন যুদ্ধ ও সংঘাত চলছে, তখন সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং নানা ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যেও ভারত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
এরপরই তিনি দেশের অর্থনীতি নিয়ে হতাশা ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, একদিকে ভারতের অর্থনীতি উন্নতির পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে কিছু মানুষ নেতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে দেশবাসীকে নিরাশ করার চেষ্টা করছেন।
এই প্রসঙ্গেই ‘ঝুট কি গুঞ্জ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই শব্দবন্ধের মাধ্যমে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর অর্থনীতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সমালোচনাকেই নিশানা করেছেন তিনি।
রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব। ফলে মোদির এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেও ভারতের অর্থনীতির বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথাও উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সংঘাত চলার কারণে বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে।
এর পাশাপাশি মার্কিন বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন এবং শুল্ক সংক্রান্ত চাপ নিয়েও ভারতের অর্থনীতিকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়াকে মোদি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেছেন।
তবে শুধু পরিসংখ্যান প্রকাশ করাই নয়, এই বৃদ্ধির গতি ধরে রাখার জন্য দেশবাসীর ভূমিকার উপরেও জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
‘ভোকাল ফর লোকাল’-এ জোর
জিডিপি বৃদ্ধির প্রসঙ্গ থেকে মোদি সরাসরি দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বানে চলে যান। তাঁর বক্তব্য, ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সাধারণ মানুষকে নিজেদের দৈনন্দিন কেনাকাটায় দেশীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর মতো প্রচারের উপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির টাকা দেশের মধ্যেই ঘুরলে তার সুফল দেশের ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে পড়বে।
তিনি বিদেশে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় খরচের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তাঁর পরামর্শ, বেড়াতে যাওয়া বা বিয়ের মতো বড় অনুষ্ঠান সম্ভব হলে দেশের মধ্যেই আয়োজন করা উচিত। একইভাবে প্রয়োজন না থাকলে বিদেশি পণ্য কেনার প্রবণতা কমানোর কথাও বলেছেন তিনি।
সোনা কেনা নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বার্তা
ভিডিও বার্তায় সোনা কেনার প্রসঙ্গও তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রয়োজন না থাকলে অতিরিক্ত সোনা কেনার বদলে সেই অর্থ দেশের অর্থনীতিতে অন্যভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মোদির বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মানুষের খরচের ধরনেও যেন দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রতিফলিত হয়। যত বেশি মানুষ দেশীয় পণ্য এবং পরিষেবা ব্যবহার করবেন, তত বেশি অর্থ দেশের ব্যবসা ও উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে—এমন যুক্তিই তুলে ধরেছেন তিনি।
বিশেষ করে যুবসমাজকে একটি শক্তিশালী ও বিকশিত ভারতের ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য এই ধরনের অভ্যাস গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি?
জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার মোট আর্থিক মূল্যের পরিমাপক। ফলে জিডিপি বৃদ্ধির হার অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি সেই অর্থে ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিশালী গতি নির্দেশ করছে। বিশেষ করে প্রত্যাশিত ৭.১ শতাংশের তুলনায় বাস্তব বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় কেন্দ্রের কাছে এটি ইতিবাচক বার্তা।
তবে একটি ত্রৈমাসিকের পরিসংখ্যান দিয়েই গোটা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি বিচার করা যায় না। পরবর্তী ত্রৈমাসিকগুলিতে বৃদ্ধির গতি কতটা বজায় থাকে, মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কী হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন ভারতের উপর কতটা প্রভাব ফেলে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট
জিডিপির পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও বার্তায় অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনীতি নিয়ে নেতিবাচক প্রচার চালানোর অভিযোগ তুলে মোদি কার্যত বিরোধীদের বক্তব্যের পালটা জবাব দিয়েছেন।
বিশেষ করে ‘ঝুট কি গুঞ্জ’ শব্দবন্ধের ব্যবহার রাজনৈতিক মহলে নজর কেড়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে আগে রাহুল গান্ধীর বিভিন্ন অভিযোগকে খণ্ডন করার জন্য একই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ফলে মোদির বক্তব্যকে নিছক অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রচার না দেখে রাজনৈতিক পালটা আক্রমণ হিসেবেও দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে
জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও ভারতের অর্থনীতির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব, জ্বালানি বাজারের ওঠানামা, বিশ্ব বাণিজ্যে পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দেশের শুল্কনীতি—সবকিছুর প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
এর পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানো এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করাও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাই জিডিপি বৃদ্ধির শক্তিশালী পরিসংখ্যানকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিণত করাই এখন বড় পরীক্ষা। উৎপাদন, পরিষেবা, বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার গতি বজায় রাখতে পারলে এই বৃদ্ধির সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধিকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভিডিও বার্তায় একদিকে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রচার, অন্যদিকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ—দুই দিকই স্পষ্ট হয়েছে। দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তকেও যুক্ত করেছেন। এখন দেখার, পরবর্তী ত্রৈমাসিকগুলিতেও ভারতের অর্থনীতির এই গতি বজায় থাকে কি না।



