শেষ হল ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘ অধ্যায়
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল আমেরিকা। পরবর্তী বছরগুলিতে দেশটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকে। ২০১১ সালে একবার মার্কিন বাহিনী ইরাক ছেড়ে গেলেও ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর ২০১৪ সালে ফের সেনা মোতায়েন করে ওয়াশিংটন।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ২০১৭ সালে ইরাকে জঙ্গি সংগঠনটির নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড পুনর্দখলের ঘোষণা করা হলেও সংগঠনটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। এখনও বিভিন্ন এলাকায় তাদের স্লিপার সেল সক্রিয় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরাকে থাকা মার্কিন সেনার মূল ভূমিকা ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি অভিযান থেকে সরে গিয়ে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি এবং নিরাপত্তা সহায়তার দিকে চলে যায়।
২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও বাগদাদ যৌথভাবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশন ধাপে ধাপে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই পরিকল্পনার শেষ পর্যায়েই ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছিল।
বাইডেনের আমলে চুক্তি, বাস্তবায়ন ট্রাম্পের সময়ে
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে শুধুমাত্র ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ওয়াশিংটন ও বাগদাদ ২০২৪ সালেই এই রূপরেখায় সম্মত হয়েছিল।
প্রথম পর্যায়ে ইরাকের বিভিন্ন অংশ থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশন গুটিয়ে নেওয়া হয়। পরে উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে সীমিত সংখ্যক মার্কিন সেনা থেকে যায়। সেখান থেকেই ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে সেই উপস্থিতিও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ৩০ সেপ্টেম্বর অবশিষ্ট মার্কিন সেনারাও ইরাক ছেড়ে যায়। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি বাইডেনের সময় নেওয়া হলেও তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে।
সাদ্দাম হোসেনের আমল থেকে আজকের ইরাক
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসছে ২০০৩ সালের যুদ্ধের স্মৃতি। সেই সময় সাদ্দাম হোসেনের সরকারের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলে আমেরিকা সামরিক অভিযান শুরু করেছিল।
পরবর্তীতে ইরাকে বিপুল পরিমাণ অনুসন্ধান চালানো হলেও সেই সময় মার্কিন প্রশাসনের করা অস্ত্রভাণ্ডার সংক্রান্ত দাবির পক্ষে প্রত্যাশিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাদ্দামকে বন্দি করার পর ইরাকি আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় ২০০৬ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
এর পরবর্তী সময়েই ইরাকে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় পরে সেই অধ্যায় শেষ হল।
তাই মার্কিন বাহিনীর এই প্রস্থানকে অনেক ইরাকি সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ইরান ও তাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলি এটিকে আমেরিকার দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান হিসেবে উদযাপন করছে।
ইরানের প্রভাব কি আরও বাড়বে?
মার্কিন বাহিনী ইরাক ছাড়ার সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ইরানের সম্ভাব্য বাড়তি প্রভাবকে ঘিরে।
ইরাক দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের জায়গা। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা যোগাযোগ—দুই দিক সামলাতে হয়েছে বাগদাদকে।
ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির একাংশ ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত। ফলে মার্কিন বাহিনী সরে যাওয়ার পর এই গোষ্ঠীগুলির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
Reuters-এর উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন উপস্থিতি এতদিন ইরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য তৈরি করেছিল। সেই সামরিক উপস্থিতি সরে যাওয়ায় তেহরানের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলির জন্য আরও বেশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিসর তৈরি হতে পারে।
মিলিশিয়াদের অস্ত্র সমর্পণ এখনও অনিশ্চিত
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজগুলির একটি হল দেশের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে মিলিশিয়াদের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি আগে যুক্ত ছিল। কিন্তু শক্তিশালী ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলির একাংশ অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রাথমিক সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বরের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে ইরাকি সরকার সেই প্রক্রিয়ার সময়সীমা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে। ফলে মার্কিন সেনা চলে গেলেও ইরাকের মাটিতে শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির উপস্থিতি এখনই শেষ হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি বাগদাদের জন্য বিশেষভাবে জটিল। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। তাদের সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করা বা একক কমান্ডের অধীনে আনা সহজ হবে না।
শুধু ইরানপন্থী গোষ্ঠী নয়, ISIS-এর ঝুঁকিও রয়েছে
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইসলামিক স্টেটের সম্ভাব্য পুনরুত্থান।
ইরাকে ২০১৭ সালে ইসলামিক স্টেটের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ শেষ হলেও সংগঠনটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় তাদের স্লিপার সেল এখনও সক্রিয় বলে নিরাপত্তা আধিকারিকদের বক্তব্য।
Reuters-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে ইরাকের কিছু নিরাপত্তা আধিকারিক ইসলামিক স্টেটের সন্দেহভাজন সেলগুলির গতিবিধি বাড়ার কথা জানিয়েছেন। কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানিও সাম্প্রতিক সময়ে এমন তৎপরতার কথা উল্লেখ করেছেন।
মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার ফলে ইরাকি বাহিনীকে এখন আরও বেশি দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিতে হবে। বিশেষ করে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশপথে নজরদারি, লজিস্টিক সহায়তা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
কুর্দিস্তান অঞ্চল নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
মার্কিন বাহিনীর শেষ পর্যায়ের উপস্থিতি ছিল ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলেও। সেখানে মার্কিন সেনা ও ঘাঁটিগুলির উপর ইরানপন্থী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
কুর্দি নেতৃত্বের একাংশ মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা সহায়তা না থাকলে কুর্দিস্তান অঞ্চল আরও বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
Financial Times-এর প্রতিবেদনে কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি মার্কিন প্রত্যাহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মার্কিন সহায়তা কমে গেলে ইরান-ঘনিষ্ঠ শক্তির বিরুদ্ধে কুর্দিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
বাগদাদ কি একাই সামলাতে পারবে?
এখন মূল প্রশ্ন, মার্কিন সেনা ছাড়া ইরাক নিজের নিরাপত্তা কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবে?
ইরাকি সেনাবাহিনী গত এক দশকে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযানে তাদের অভিজ্ঞতাও বেড়েছে। কিন্তু মার্কিন সহায়তার জায়গাগুলি পুরোপুরি পূরণ করা সহজ নয়।
বিশেষ করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, স্যাটেলাইট ও ড্রোন নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সামরিক লজিস্টিক ব্যবস্থায় ইরাককে এখনও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ইরাক ইতিমধ্যেই নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে। তবে স্বাধীনভাবে পুরো আকাশসীমা রক্ষা করার সক্ষমতা তৈরি করতে আরও সময় লাগতে পারে।
অর্থাৎ মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান মানেই ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাগদাদের সামনে যে বড় পরীক্ষা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
আমেরিকা কি পুরোপুরি ইরাকের বাইরে?
সামরিক বাহিনী সরে গেলেও ইরাকের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যে ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখার আলোচনা রয়েছে। সামরিক ঘাঁটিতে স্থায়ী সেনা না রেখেও প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা অন্যান্য নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় থাকতে পারে।
অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনা মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ইরাকভিত্তিক মিশনের সমাপ্তি। এর অর্থ দুই দেশের কূটনৈতিক বা নিরাপত্তা সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ নয়।
এই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী নীতি এবং ইরাকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন অধ্যায়ের সামনে ইরাক
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইরাকের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হল। ২০০৩ সালের আগ্রাসন, সাদ্দামের পতন, মার্কিন দখলদারিত্ব, ২০১১ সালের প্রত্যাহার, ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ফের মার্কিন সেনা প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির নিরাপত্তা রাজনীতির সঙ্গে আমেরিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
এখন সেই জায়গায় ইরাককে অনেক বেশি নিজস্ব সক্ষমতার উপর নির্ভর করতে হবে।
একদিকে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ইসলামিক স্টেটের স্লিপার সেলের মোকাবিলা, তার সঙ্গে কুর্দিস্তান অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে বাগদাদকে।
তাই মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেউ ইরাকের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের কাছে এটি নতুন অনিশ্চয়তার সূচনাও। শেষ পর্যন্ত ইরাক কতটা সফলভাবে এই পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



