ভোরের অন্ধকারে হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো শব্দ, তারপর মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা—হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে মঙ্গলবার এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চিরঞ্জিপুর এলাকার পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ন্যাফথা বহনকারী একটি পাইপলাইনে আগুন লাগে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আগুন লাগার আগে থেকেই এলাকায় গ্যাসের তীব্র গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগুন লাগার পর মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের এলাকা আতঙ্কে ভরে ওঠে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কিছু বাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
ঘটনায় অন্তত ২২ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রিন করিডর করে কলকাতার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, দগ্ধদের অবস্থা জটিল হওয়ায় বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের সরাসরি প্রভাব পড়ে রেল পরিষেবায়ও। আগুনের তীব্রতায় নিকটবর্তী ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইন এবং ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে হলদিয়া–পাঁশকুড়া রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একাধিক লোকাল ট্রেন বাতিল বা আংশিকভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে রেল সূত্রে খবর। রেল আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত পরিষেবা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন, তবে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক ইঞ্জিন মোতায়েন করা হয়েছে। অন্তত ১০ থেকে ১২টি দমকল ইঞ্জিন একযোগে কাজ করছে। তবে ন্যাফথা জাতীয় দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন নেভানোর কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগছে। আগুন যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সেই দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার পর থেকেই শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অবহেলা চলছিল। নিয়মিত সতর্কতা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করছেন অনেক কর্মী। দুর্ঘটনার পর সংস্থার বিরুদ্ধে চরম অবহেলার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করেছেন শ্রমিকদের একাংশ।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “রাতে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনি। বেরিয়ে দেখি চারপাশে আগুন জ্বলছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।” আরেকজনের দাবি, আগেই গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ ও জরুরি পরিষেবা মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। যদিও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এখনও চূড়ান্ত ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে শিল্পাঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দমকল, রেল ও প্রশাসন যৌথভাবে কাজ চালালেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে বলে অনুমান। এই ঘটনার পর ফের উঠে এসেছে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন।
হলদিয়ার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত কারণ জানা যাবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।



