আচমকাই ফুলে উঠল কোট্টাপুঝা নদী
রবিবার বিকেলে মালাপ্পুরমের নীলাম্বুর এলাকার কোট্টাপুঝা নদীতে আচমকা জলস্তর বেড়ে যায়। পুক্কোট্টুমপাডমের টিকে কলোনির কাছে নদীর জল ভয়াবহ স্রোত তৈরি করে। ওই এলাকা স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে পরিচিত জায়গা হওয়ায় ছুটির দিনে সেখানে যথেষ্ট ভিড় ছিল।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, নদীর তীরবর্তী উলারভাট্টম থেকে টিকে কলোনি পর্যন্ত অংশে হঠাৎ জল বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকজন স্রোতে ভেসে যান। আশ্চর্যের বিষয়, ঘটনাস্থলের আশপাশে তখন উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হচ্ছিল না। উজানের জঙ্গল এলাকায় প্রবল বৃষ্টির জেরেই নদীতে আচমকা জল নেমে আসে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
প্রথম দিকে পাঁচজনের একটি দল ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও পরে আরও কয়েকজন নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ, ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস এবং প্রশিক্ষিত ডুবুরিরা রাত থেকেই উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
কোট্টাপুঝায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচ
সোমবার সকালে উদ্ধারকাজ ফের জোরদার হওয়ার পর নদী থেকে আরও দেহ উদ্ধার করা হয়। সকাল পর্যন্ত কোট্টাপুঝা নদীর হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ। এখনও একজনের খোঁজ চলছে।
প্রাথমিকভাবে উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে কয়েকজন পুরুষ এবং এক মহিলা রয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে টিকে কলোনির বাসিন্দা সাজিতার নামও রয়েছে। তিনি নদীর ধারে কাপড় কাচছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নদীর তীব্র স্রোত এবং অন্ধকার। পরে জলস্তর কিছুটা কমে আসায় সোমবার সকালে তল্লাশি আরও জোরদার করা সম্ভব হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার ছবি দেখে বাড়ছে ভিড়?
কোট্টাপুঝা নদীর এই অংশটি কোনও আনুষ্ঠানিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওর কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
নদীর পাথুরে অংশ এবং আকস্মিক জলস্তর বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সেখানে নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। রবিবারের দুর্ঘটনার পর অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং বিপজ্জনক নদী এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
কোট্টাকাম্বুরে ভূমিধসে দুই ভাই-বোনের মৃত্যু
মালাপ্পুরমের পাশাপাশি ইডুক্কি জেলার কোট্টাকাম্বুরেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে কৃষিজমিতে কাজ করছিলেন দুই ব্যক্তি। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তাঁরা একটি অস্থায়ী শেডে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
সেই সময় হঠাৎ পাহাড়ের মাটি ধসে শেডটির উপর এসে পড়ে। মাটির নিচে চাপা পড়ে দুই ভাই-বোনের মৃত্যু হয়। তাঁদের সঙ্গে থাকা এক মহিলা গুরুতর আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় শুধু নদী নয়, ঢালু জমি ও অস্থায়ী নির্মাণগুলিও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কোট্টায়ামেও প্রাণহানি
কেরলের কোট্টায়াম জেলাতেও পৃথক ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। তিকোয়ির কাছে ভেলাথুসেরিতে ভূমিধসের জেরে একটি বাইক মাটির নিচে চাপা পড়ে। তামিলনাড়ুর এক মহিলা পর্যটকের মৃত্যু হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক মহিলা উদ্ধার পান।
অন্যদিকে, পুঞ্জার নাদুভাগাম এলাকার মঙ্গলাগিরিতে ভূমিধসে একটি বাড়ির উপর মাটি ধসে পড়ে। সেখানে ৮০ বছরের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মালাপ্পুরমের হড়পা বান এবং ইডুক্কি-কোট্টায়ামের ভূমিধস মিলিয়ে রবিবারের বৃষ্টিজনিত বিপর্যয়ে রাজ্যে প্রাণহানি দ্রুত বেড়েছে।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯, চলছে নজরদারি
সোমবারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, কেরলে বৃষ্টিজনিত ঘটনায় মৃতের সংখ্যা অন্তত ৯। এর মধ্যে মালাপ্পুরমের কোট্টাপুঝা নদীর হড়পা বানে পাঁচজন, ইডুক্কিতে দু’জন এবং কোট্টায়ামে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। মালাপ্পুরমে এখনও একজন নিখোঁজ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনগুলিকে পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখতে বলা হয়েছে।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ
কেরলের মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন রাজ্যের বৃষ্টিজনিত পরিস্থিতি নিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। ইডুক্কি ও কোট্টায়ামের জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়েছে।
প্রয়োজনে বিপজ্জনক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করতে এসএমএস সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
মালাপ্পুরমের নীলাম্বুরে উদ্ধারকাজে বিশেষ দল মোতায়েন করা হয়েছে। নদীর জলস্তর কমে আসায় নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে তল্লাশি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি
প্রবল বৃষ্টির পরিস্থিতির মধ্যেই কেরলের কয়েকটি জেলায় আবহাওয়া সতর্কতা জারি করেছে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর। ছয়টি জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বাকি কয়েকটি জেলায় হলুদ সতর্কতা রয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার পাশাপাশি বজ্রবিদ্যুৎ ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এর ফলে পাহাড়ি এলাকা, নদী সংলগ্ন অঞ্চল এবং নিচু জায়গাগুলিতে নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উজানে প্রবল বৃষ্টি হলে নিচের দিকে থাকা নদীগুলিতে আচমকা জলস্তর বেড়ে যেতে পারে।
সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ
রবিবারের দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আকস্মিক হড়পা বান ও ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে নদীর বিপজ্জনক অংশে না যাওয়ার এবং পাহাড়ি এলাকায় প্রয়োজন ছাড়া যাতায়াত এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে যে জায়গাগুলিতে নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে পারে, সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ নীলাম্বুরের ঘটনাতেই দেখা গিয়েছে, ঘটনাস্থলে বৃষ্টি না থাকলেও উজানের প্রবল বৃষ্টির জেরে আচমকা নদী ফুলে উঠতে পারে।
সামনে আরও বৃষ্টি, বাড়ছে উদ্বেগ
কেরলের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। একদিকে উদ্ধারকাজ চলছে, অন্যদিকে আবহাওয়া দপ্তরের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নতুন করে ভূমিধস, হড়পা বান এবং জল জমার আশঙ্কা থাকছে।
প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধার ও ত্রাণ ব্যবস্থা বাড়ানোর প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। নীলাম্বুরে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়াই এখন অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, একদিনের প্রবল বৃষ্টিতে কেরলের একাধিক জেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোট্টাপুঝা নদীর হড়পা বানে পাঁচজনের মৃত্যু এবং একজনের নিখোঁজ থাকার পাশাপাশি ইডুক্কি ও কোট্টায়ামে ভূমিধসে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ হওয়ায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি প্রশাসনের নজর এখন আবহাওয়ার পরবর্তী গতিপথের দিকে।



