বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা টানাপোড়েনের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বৃহস্পতিবার বিচারপতি কৃষ্ণা রাও অন্তর্বর্তী পর্যায়ে জানিয়ে দেন, এই মুহূর্তে স্পিকারের সিদ্ধান্তে আদালত কোনও হস্তক্ষেপ করছে না। এর ফলে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বীকৃতি বহাল থাকছে।
এই নির্দেশের পর আপাতত বিধানসভার অন্দরে বিরোধী নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আদালতের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে। ফলে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ঋতব্রতের সামনে আর কোনও তাৎক্ষণিক আইনি বাধা থাকল না।
শুধু বিরোধী দলনেতাই নন, বিধানসভায় বিরোধী শিবিরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীরাও আপাতত স্বস্তি পেলেন। উপ-দলনেতা এবং মুখ্য সচেতক পদে যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁরাও নিজেদের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে পারবেন। আদালতের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্পিকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত গোটা বিরোধী কাঠামোই আপাতত বহাল রইল।
উল্লেখ্য, রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই বিরোধী দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব নিয়ে মতভেদ সামনে আসে। নির্বাচনী ফলাফলের পর পরিষদীয় নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। সই জালিয়াতির অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, বহিষ্কার এবং দলের একাংশের বিদ্রোহ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বিধায়কদের এক বড় অংশ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানায় এবং সেই সিদ্ধান্তে সম্মতি দেন বিধানসভার স্পিকার।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তৃণমূলের একাংশের নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দাবি ছিল, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং স্পিকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। সেই আবেদন নিয়েই বৃহস্পতিবার আদালতে শুনানি হয়।
শুনানির পর বিচারপতি কৃষ্ণা রাও স্পষ্ট করে দেন, মামলার পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তারিত শুনানি চলবে ঠিকই, তবে এই মুহূর্তে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। ফলে স্পিকারের অনুমোদন পাওয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই নির্দেশ নিঃসন্দেহে ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর জন্য ধাক্কা। কারণ, আদালতের অন্তর্বর্তী অবস্থান কার্যত বিরোধী শিবিরের বর্তমান নেতৃত্বকেই বৈধতা দিল। যদিও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বাকি রয়েছে, তবুও অন্তর্বর্তী পর্যায়ে এই রায় রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আদালতের নির্দেশ প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী শিবিরে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, বিধানসভার নিয়ম মেনেই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছিল এবং স্পিকারের স্বীকৃতিও সেই নিয়ম অনুসারেই দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশে সেই অবস্থান আরও শক্তিশালী হল বলে মনে করছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, মামলাকারী শিবির এখনও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টির আইনি দিক এখনও শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী শুনানিতে তাঁরা নিজেদের যুক্তি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবেন।
এদিকে, রাজ্যের প্রথম বাজেট অধিবেশন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। রাজ্যপালের ভাষণের মধ্য দিয়ে অধিবেশনের সূচনা হয়েছে এবং আগামী কয়েকদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলনেতার পদে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা বিধানসভার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারত। আদালতের নির্দেশে সেই আশঙ্কা আপাতত কেটে গেল।
বিধানসভা সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ই অধিবেশনে অংশ নেবেন এবং বিরোধী পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরবেন। একইসঙ্গে অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিধায়করাও তাঁদের নিজ নিজ সাংগঠনিক ও পরিষদীয় ভূমিকা পালন করবেন।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশে আপাতত জট কাটলেও বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখনও পুরোপুরি মেটেনি। জুলাই মাসে মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে তাই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। সেই শুনানিতে আদালত কী অবস্থান নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে বিধানসভায় বিরোধী নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ সমীকরণ।



