গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে আচমকা বিপর্যয়
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে রবিবার আচমকাই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটে নাগাদ কলোরাডো নদীর জলস্তর অস্বাভাবিক দ্রুততায় বাড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর স্রোত ভয়ংকর রূপ নেয়।
সেই সময় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের বিভিন্ন অংশে পর্যটকদের ভিড় ছিল। আচমকা জলের তোড় নেমে আসায় অনেকেই বিপদের মধ্যে পড়েন। নদীর কাছাকাছি থাকা মানুষজনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু স্রোতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বেশ কয়েকজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় জল।
প্রাথমিক উদ্ধারকাজে ৬২ জনকে নিরাপদে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেককে হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গত এলাকা থেকে বের করে আনা হয়। তবে অন্তত ২০ জন এখনও নিখোঁজ। একজনের দেহও উদ্ধার করা হয়েছে।
পাহাড়ি খাঁড়ি থেকে হঠাৎ নেমে এল জল
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, ‘ব্রাইট অ্যাঙ্গেল’ খাঁড়ির দিক থেকে আচমকা বিপুল পরিমাণ জল কলোরাডো নদীতে এসে মিশতে শুরু করে। স্বাভাবিক নদীর স্রোতের তুলনায় সেই জলপ্রবাহের গতি এবং পরিমাণ ছিল অনেক বেশি।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমান, ওই এলাকায় ভারী বৃষ্টির জেরেই এমন আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর বৃষ্টি হলে খাঁড়ি ও ছোট জলধারাগুলিতে দ্রুত জল জমে গিয়ে নিচের দিকে প্রবল স্রোত তৈরি হতে পারে। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো খাড়া ভূপ্রকৃতিতে সেই স্রোত আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
তবে ঠিক কী কারণে এত দ্রুত জলস্তর বেড়ে গেল, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। আবহাওয়া এবং জলপ্রবাহের তথ্য খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
ভেসে গেল পাথর, ধাতব কাঠামো, ভেঙে পড়ল ফুটব্রিজ
হড়পা বানের জলের শক্তি কতটা ছিল, তা বোঝা যাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির ছবি থেকেই। প্রবল স্রোতে বড় বড় পাথর এবং লোহার কাঠামো পর্যন্ত ভেসে যায়। পর্যটকদের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত একটি ফুটব্রিজও ভেঙে পড়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা পরিকাঠামোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেখানে সাধারণ সময়ে পর্যটকদের যাতায়াত থাকে, সেই জায়গাগুলিতে নতুন করে কোনও বিপদ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন নিখোঁজদের খুঁজে বের করা। নদীর স্রোত এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
হেলিকপ্টারে উদ্ধার ৬২ জন
দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী দল তৎপর হয়ে ওঠে। নদী সংলগ্ন বিপজ্জনক এলাকা থেকে মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আকাশপথেও উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
যে জায়গা দিয়ে সাধারণত পর্যটকরা কলোরাডো নদীর কাছে পৌঁছন, সেখান থেকে ৬২ জনকে হেলিকপ্টারের সাহায্যে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে দুর্গম গিরিখাত, পাথুরে এলাকা এবং দ্রুতগতির জলস্রোতের কারণে এখনও নিখোঁজদের খোঁজে সমস্যা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা নদীর বিভিন্ন অংশ এবং আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছেন।
নিখোঁজদের সন্ধানে জোর তল্লাশি
প্রশাসনের তরফে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। স্থলপথের পাশাপাশি আকাশপথ থেকেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদীর স্রোত কোন দিকে যাচ্ছে এবং জলের সঙ্গে কেউ ভেসে গিয়ে কোথায় আটকে থাকতে পারেন, সেই সম্ভাবনাগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একজনের মৃত্যুর খবর ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে। তবে নিখোঁজের সংখ্যা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এখনও পরিবর্তিত হতে পারে। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রশাসন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদেরও সতর্ক করেছে। জলস্তর এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নদী ও খাঁড়ির কাছাকাছি না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে কেন হড়পা বান এত বিপজ্জনক?
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দীর্ঘ ও গভীর পাথুরে গিরিখাতের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এমন যে পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি হলে তার জল দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।
বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া আকস্মিক জলপ্রবাহ বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড অত্যন্ত বিপজ্জনক। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শান্ত জলধারা ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হতে পারে। ফলে আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলেও অন্য কোনও এলাকায় হওয়া ভারী বৃষ্টির প্রভাব নিচের দিকে পড়তে পারে।
রবিবারের ঘটনাতেও এমন কোনও আকস্মিক জলপ্রবাহের কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে যান। ফলে এমন দুর্ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
আচমকা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে পর্যটকদের কত দ্রুত সতর্ক করা যায়, নদীর কাছে থাকা পর্যটকদের কীভাবে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দল কতটা দ্রুত পৌঁছতে পারে—এসব বিষয় নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং আকস্মিক বন্যার সতর্কবার্তা পর্যটকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ছে উদ্বেগ
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিখোঁজ ২০ জনকে ঘিরে। তাঁদের মধ্যে কতজন জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তা এখনও জানা যায়নি। উদ্ধারকারীরা নদীর স্রোত, দুর্গম ভূখণ্ড এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশাসনের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ৬২ জনকে ইতিমধ্যেই উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য সামনে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, নেপালের ভয়াবহ বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই আমেরিকার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে হড়পা বানের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রে আচমকা জলের স্রোতে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনায় এখন সবার নজর উদ্ধার অভিযানের দিকে। নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করাই এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।



