বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বাড়ি কিনে পিজি ব্যবসা
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সত্য নিকেতনের পুরনো বাড়িটির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা দেখেছিলেন হরিরাম গুপ্তা। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ৫০ বছরের পুরনো ওই বাড়িটি পরে রং করে পিজি বা মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া শুরু হয়।
বাড়িটি কাগজে তাঁর স্ত্রী উর্মিলা গুপ্তার নামে ছিল। কিন্তু পাঁচতলা ভবনটির দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন হরিরাম এবং তাঁর ছেলে মহেশ। ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য একাধিক ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।
বাড়ির প্রতিটি ঘরে তিনজন করে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে তদন্তে জানা গিয়েছে। প্রত্যেক আবাসিকের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হত। অর্থাৎ একটি ঘর থেকেই মাসে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আসত।
এইভাবে একাধিক ঘর ভাড়া দেওয়ার ফলে বাড়িটি থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৪ লক্ষ টাকা আয় হত বলে পুলিশ সূত্রে খবর। ফলে একটি পুরনো আবাসিক ভবনকে কার্যত লাভজনক পিজি ব্যবসায় পরিণত করেছিলেন বাড়ির মালিক।
অবসরপ্রাপ্ত বায়ুসেনা সার্জেন্ট হরিরাম
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, হরিরামের মূল বাড়ি গুরুগ্রামে। দীর্ঘ সময় ভারতীয় বায়ুসেনায় সার্জেন্ট হিসেবে কাজ করার পর তিনি অবসর নেন। এরপর বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
পুলিশের দাবি, তাঁর ব্যবসার অন্যতম ক্ষেত্র ছিল সম্পত্তি ও পিজি পরিচালনা। গুরুগ্রামেও তাঁর আরও কয়েকটি সম্পত্তি রয়েছে বলে তদন্তে জানা গিয়েছে।
হরিরামের পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পর্কেও তথ্য সামনে এসেছে। তাঁর এক ছেলে পেশায় পাইলট। তবে সত্য নিকেতনের বাড়ি ধসের ঘটনায় তাঁর কোনও যোগসূত্র রয়েছে বলে এখনও জানা যায়নি।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ, ভাড়াটেদের নিরাপত্তা এবং নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের ভূমিকা কী ছিল।
বাড়িতে থাকতেন বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া
রবিবার দুপুরে দিল্লির মোতিবাগ এলাকায় প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আচমকাই পাঁচতলা বাড়িটি ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থল চাণক্যপুরী এলাকার কাছাকাছি।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে মূলত পড়ুয়া ও তরুণরা পেইং গেস্ট হিসেবে থাকতেন। রবিবার ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই তখন বাড়িতে ছিলেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে অন্তত ৫০ জন পড়ুয়া থাকতে পারেন। ফলে বাড়ি ভেঙে পড়ার পর উদ্ধারকারী দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের সন্ধানে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকাজ চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা সাতজনে পৌঁছয়।
মাসে চার লক্ষ টাকার ব্যবসা, কিন্তু নিরাপত্তা কোথায়?
তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত বেশি সংখ্যক মানুষকে নিয়ে পিজি চালানোর সময় ভবনটির নিরাপত্তা ও কাঠামোগত স্থায়িত্ব কতটা পরীক্ষা করা হয়েছিল।
একদিকে প্রতি ঘরে তিনজন করে আবাসিক রাখার ব্যবস্থা, অন্যদিকে পাঁচতলা পুরনো ভবন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ভবনটির উপর যথেষ্ট চাপ তৈরি হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে পিজি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ভবনের কাঠামো, অনুমোদিত উচ্চতা এবং নির্মাণবিধি কতটা মানা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে দুর্ঘটনার আগে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ বা কোনও অংশে নির্মাণকাজ চলছিল কি না, সেটিও পুলিশ পরীক্ষা করছে।
বেসমেন্টে চলছিল নির্মাণকাজ?
প্রাথমিক তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই এলাকায় একাধিক মেস বা পিজি বাড়ির নিচে বেসমেন্ট রয়েছে। সত্য নিকেতনের ভেঙে পড়া বাড়িটির নিচেও জল জমেছিল বলে জানা গিয়েছে।
শুক্রবার থেকে দিল্লিতে টানা বৃষ্টির কারণে মাটির নিচে জল ঢুকে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই বাড়িটির বেসমেন্টে নির্মাণকাজ চলছিল বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান তদন্তকারীদের।
বেসমেন্টে নির্মাণকাজের ফলে ভবনের ভিত বা স্তম্ভের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টির জল জমে মাটির স্থিতিশীলতা কমে যাওয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে কোনও একটি কারণকেই চূড়ান্ত বলে মানছে না পুলিশ। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই ভবন ধসের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ
ভবনটির উচ্চতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দিল্লি পুরসভার প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় আবাসিক ভবনের অনুমোদিত উচ্চতা সর্বাধিক ১৭.৫ মিটার হতে পারে।
কিন্তু সত্য নিকেতনের ওই বাড়িটি নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি উঁচু ছিল বলে পুরসভার তরফে দাবি করা হয়েছে।
যদি তদন্তে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে নির্মাণ অনুমোদন, ভবনের নকশা এবং পরবর্তীকালে করা পরিবর্তন নিয়ে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আরও প্রশ্ন উঠতে পারে।
পুরনো বাড়িকে নতুনভাবে ব্যবহার করার সময় প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, পিজি হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ম মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
গ্রেপ্তার হরিরাম, স্ত্রী ও ছেলে
বাড়ি ধসের ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই হরিরাম গুপ্তা, তাঁর স্ত্রী উর্মিলা এবং ছেলে মহেশকে গ্রেপ্তার করেছে।
রাজস্থানের ভিয়াডা এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। পরে দিল্লিতে এনে আদালতে পেশ করা হয়।
আদালত হরিরাম ও উর্মিলাকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠিয়েছে। তাঁদের ছেলে মহেশকে দেওয়া হয়েছে দু’দিনের জেল হেফাজত।
তদন্তকারীরা এখন তাঁদের কাছ থেকে বাড়িটির মালিকানা, পিজি ব্যবসা, ভাড়াটেদের সংখ্যা, নির্মাণকাজ এবং ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে তথ্য জানতে চাইছেন।
কেন রাজস্থানে গিয়েছিলেন তাঁরা?
ঘটনার পর বাড়ির মালিক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দিল্লিতে না থেকে রাজস্থানের দিকে চলে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সেখান থেকেই তাঁদের আটক করে পুলিশ।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, দুর্ঘটনার পর তাঁরা কেন দিল্লি ছেড়েছিলেন এবং তাঁদের কাছে ভবনটির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল কি না।
তবে শুধুমাত্র ঘটনাস্থল থেকে দূরে চলে যাওয়াকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। তাঁদের বিরুদ্ধে ঠিক কী কী অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তা তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করবে।
উদ্ধারকাজে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ
বাড়িটি ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করাই ছিল উদ্ধারকারী দলের প্রধান লক্ষ্য। ভারী বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
ধসে পড়া কাঠামোর ভিতরে একাধিক মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। ফলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হয়।
প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করে জীবিতদের সন্ধান চালানো হয়। পাশাপাশি নতুন করে কোনও অংশ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও ছিল। শেষ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান থেকে একাধিক মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ভবনটির নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশাসনিক স্তরেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দিল্লির পিজি সংস্কৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন
সত্য নিকেতনের ঘটনা দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা পিজি ও মেস সংস্কৃতির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং কোচিং কেন্দ্রের আশপাশে পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীদের থাকার চাহিদা বেশি। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বহু পুরনো বাড়িকেও পিজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু আবাসিক ভবনের অনুমোদন এবং পিজি ব্যবহারের নিয়মের মধ্যে ফারাক থাকলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একটি বাড়িতে তার কাঠামোগত ক্ষমতার তুলনায় বেশি মানুষ থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
সত্য নিকেতনের ঘটনা সেই ঝুঁকিকেই সামনে এনে দিয়েছে।
আরও বাড়ির উপর নজর প্রশাসনের
এই দুর্ঘটনার পর দিল্লির পুরসভা এবং প্রশাসন একই ধরনের পুরনো ভবনগুলির নিরাপত্তা নিয়ে নজরদারি বাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব বাড়ি মেস বা পিজি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে অনুমোদিত নির্মাণ, ভবনের বয়স, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং বাসিন্দাদের সংখ্যা খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোনও বাড়িতে বেসমেন্টে নির্মাণকাজ চলছে কি না, জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক রয়েছে কি না এবং অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবনে পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও ভবিষ্যতের পরিদর্শনে গুরুত্ব পেতে পারে।
আসল কারণ জানতে তদন্তের অপেক্ষা
হরিরাম গুপ্তা এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তারির পর তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পিজি ব্যবসা থেকে বিপুল আয় হলেও ভবনটির নিরাপত্তা ও নির্মাণবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বেসমেন্টে নির্মাণকাজ, টানা বৃষ্টিতে জল জমা, ভবনের বয়স এবং অনুমোদিত উচ্চতা নিয়ে ওঠা অভিযোগ—সবকটি বিষয় একসঙ্গে পরীক্ষা করছে পুলিশ ও পুরসভা।
তদন্তে যদি নিয়ম লঙ্ঘন বা গাফিলতির প্রমাণ মেলে, তাহলে তার ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ হতে পারে। অন্যদিকে কোনও অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের দোষী বলা যাবে না।
সব মিলিয়ে, দিল্লির সত্য নিকেতনের বাড়ি ধসের ঘটনা শুধুমাত্র একটি নির্মাণ দুর্ঘটনা নয়, বরং পুরনো বাড়িকে পিজি হিসেবে ব্যবহার, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ভবনের নিরাপত্তা এবং নির্মাণবিধি মানার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। এক ঘরে তিনজন করে আবাসিক রেখে মাসে কয়েক লক্ষ টাকা আয় করা হলেও সেই বাড়ির কাঠামোগত নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল, তার উত্তরই এখন খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। হরিরাম, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের গ্রেপ্তারের পর তদন্ত কোন দিকে এগোয়, তার উপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে।



