দিল্লিতে পেজেস্কিয়ান, বৈঠকে মোদির সঙ্গে আঞ্চলিক সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত এবং উত্তেজনার মধ্যেই ভারত সফরে এসেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান। শনিবার থেকে তাঁর একাধিক সরকারি কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত ও ইরানের দুই শীর্ষ নেতার এই সাক্ষাৎকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। কারণ, ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ যখন বাড়ছে, তখন দিল্লির সঙ্গে তেহরানের রাজনৈতিক যোগাযোগও সক্রিয় রয়েছে।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তার বিষয়টি ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মোদি স্পষ্ট করেছেন বলে সূত্রের খবর।
হরমুজ ঘিরে ভারতের উদ্বেগ কোথায়?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সমুদ্রপথের নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সমুদ্রে যাত্রী ও নৌ-পরিবহণের নিরাপত্তাকে ভারত অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। মোদির বক্তব্যে সেই বিষয়টিই বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
ভারত বরাবরই জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনও সংঘাতকে আরও বাড়ানোর বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা যাতে বিপন্ন না হয়, সেটাই নয়াদিল্লির অন্যতম উদ্বেগ।
ফলে পেজেস্কিয়ানের সঙ্গে মোদির বৈঠককে শুধুমাত্র ভারত-ইরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচনায় সীমাবদ্ধ করে দেখছে না আন্তর্জাতিক মহল।
এগারো দিনের মধ্যে দ্বিতীয়বার মোদি-পেজেস্কিয়ান
এই বৈঠকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল সময়ের ব্যবধান। এর আগে ৩১ আগস্ট সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও বৈঠকের ফাঁকে মোদি এবং পেজেস্কিয়ান দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছিলেন।
তারপর মাত্র এগারো দিনের মধ্যেই ফের মুখোমুখি হলেন দুই নেতা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই দফা সরাসরি আলোচনা হয়েছে তাঁদের মধ্যে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঘন ঘন যোগাযোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। ভারত একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে আমেরিকা-সহ পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মধ্যেই তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ নয়াদিল্লির অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
ব্রিকস মঞ্চে পেজেস্কিয়ানের বক্তব্যে আমেরিকাকে বার্তা?
মোদির সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি শুক্রবার ব্রিকস মঞ্চে পেজেস্কিয়ানের বক্তব্যও আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্ব বর্তমানে জটিল পরিস্থিতি এবং গভীর ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিজেদের জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আমেরিকার সামরিক নীতি এবং নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা। পেজেস্কিয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে অন্য দেশের বৈধ বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
ব্রিকসের মধ্যে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ডলারের আধিপত্য নিয়েই কি আসল বার্তা?
পেজেস্কিয়ানের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ভূমিকা। ব্রিকসের দেশগুলি নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের নির্ভরতা কমতে পারে।
এই বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার উদ্বেগ নতুন নয়। ব্রিকস দেশগুলি বিকল্প আর্থিক কাঠামো তৈরির দিকে এগোলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের প্রভাব কমার সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
তাই পেজেস্কিয়ানের বক্তব্যকে শুধুমাত্র ইরানের অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ব্রিকসের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়েও এর মধ্যে একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
বিশেষ করে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে ব্রিকসের আর্থিক স্বাধীনতার কথা বলায় বক্তব্যটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে।
ভারত-ইরান সম্পর্কের পুরনো ভিত্তি
দুই দেশের বর্তমান কূটনৈতিক যোগাযোগের পিছনে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে।
পেজেস্কিয়ানকে ভারতে স্বাগত জানিয়ে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও দুই দেশের গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও ইরানের সম্পর্কের ভিত তৈরি হয়েছে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর।
ব্রিকসের সদস্য হিসেবে দুই দেশই যৌথ অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও নয়াদিল্লি-তেহরান সম্পর্ককে শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে দেখছে না ভারত।
আমেরিকার জন্য কেন বিষয়টি অস্বস্তির?
ইরানের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ওয়াশিংটনের নজর এড়াবে না বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। এর অন্যতম কারণ হল, ইরান বর্তমানে আমেরিকার সঙ্গে তীব্র সংঘাতের মধ্যে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’বার বৈঠক করলেন। তার উপর ব্রিকস মঞ্চে পেজেস্কিয়ান আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক আধিপত্যের সমালোচনা করেছেন।
ফলে দিল্লির সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ককে আমেরিকা কীভাবে দেখছে, তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
তবে ভারতের অবস্থানকে সরাসরি কোনও পক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নয়াদিল্লি বরাবরই বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে এসেছে।
যুদ্ধ নয়, কূটনীতিতেই জোর ভারতের
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ভারতের অবস্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আলোচনা এবং কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে থাকা।
ইরান সফর বা ইরানের সঙ্গে বৈঠক মানেই কোনও সামরিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়—বরং সংঘাতের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখাই ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
মোদির বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসাও সেই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভারতের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা সরাসরি সম্পর্কিত।
সামনে কোন দিকে যাবে ভারত-ইরান সম্পর্ক?
পেজেস্কিয়ানের সফরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরও কিছু বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বাণিজ্য, যোগাযোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থ রয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে যুদ্ধের আবহে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, অন্যদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ—দুই দিকই সামলাতে হবে নয়াদিল্লিকে।
মাত্র এগারো দিনের মধ্যে মোদি-পেজেস্কিয়ানের দ্বিতীয় বৈঠক সেই কূটনৈতিক তৎপরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দিল্লিতে মোদি-পেজেস্কিয়ান বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। হরমুজ-সহ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কূটনীতির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার বার্তা দিয়েছে ভারত। অন্যদিকে ব্রিকস মঞ্চে পেজেস্কিয়ানের ডলার-নির্ভরতা কমানো এবং আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ফলে এই সফর শুধু ভারত-ইরান সম্পর্কের নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



