বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতি
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, নির্যাতিতা কিশোরীর সঙ্গে অভিযুক্তদের একজনের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। ওই ১৭ বছরের কিশোরকেই নিজের বন্ধু বলে জানত সে। তার সঙ্গে দেখা করতেই কিশোরী ঘটনাস্থলের দিকে গিয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই যুবকের সঙ্গে আরও তিনজনের যোগাযোগ ছিল। চারজনই পরস্পরের পরিচিত। ঘটনার দিন তাঁরা একটি টেম্পোয় ছিলেন এবং মদ্যপান করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে মোড় নেয় বলে অভিযোগ। পুলিশ জানিয়েছে, প্রথমে ওই ১৭ বছরের অভিযুক্ত কিশোরীর উপর যৌন নির্যাতন করে বলে অভিযোগ। পরে কিশোরী ঘটনাটি পুলিশকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে অন্যদের ডেকে আনা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, এরপর সকলে মিলে তার উপর যৌন নির্যাতন করে।
তবে ঘটনার সম্পূর্ণ ক্রম এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট ভূমিকা এখনও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ফরেন্সিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হবে।
ধর্ষণের পর ছুরি দিয়ে হামলার অভিযোগ
তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যৌন নির্যাতনের পর কিশোরীকে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, তাকে ছুরি দিয়ে একাধিকবার আঘাত করা হয়েছিল। পরে দেহটি একটি নির্জন মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে পাতা ও মাটি দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
ঘটনাস্থল এবং অভিযুক্তদের কাছ থেকে দুটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। একইসঙ্গে অভিযুক্তদের পরনের পোশাকও উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
পুলিশের এক তদন্তকারী আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোরীর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। মেডিক্যাল পরীক্ষাতেও যৌন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। দেহের উপর অন্তত আটটি ক্ষতচিহ্নের কথা তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
মাঠে পড়ে ছিল দেহ, পরে কুকুরে ক্ষতবিক্ষত
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে কয়েক দিন পরে। ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে Swaroop Nagar-এর Kushak Road সংলগ্ন একটি মাঠে দেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে।
ততক্ষণে দেহটি যথেষ্ট পচে গিয়েছিল। খোলা জায়গায় পড়ে থাকার কারণে দ্রুত দেহের অবনতি হয় বলে তদন্তকারীদের ধারণা। স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ জানিয়েছে, দেহের উপর কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণের চিহ্ন ছিল।
দেহের একটি হাত আলাদা অবস্থায় পাওয়া যায়। মুখও এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে প্রথমে মৃতার পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি দেহের অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে লিঙ্গও নিশ্চিত করা যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে স্থানীয়দের সহায়তা এবং পরিবারের তথ্যের ভিত্তিতে মৃতার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
৫০টির বেশি CCTV ফুটেজে মিলল টেম্পোর সূত্র
দেহ উদ্ধারের পর তদন্তে নামে Delhi Police। প্রথম দিকে ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনও প্রত্যক্ষদর্শী বা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারীরা এলাকার CCTV ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা শুরু করেন।
পুলিশ ৫০টির বেশি CCTV ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে একটি টেম্পোর গতিবিধি শনাক্ত করে। সন্দেহজনক সময়ে ওই গাড়িটিকে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি দেখা গিয়েছিল। রাতের অন্ধকারের কারণে প্রথম দিকে গাড়িটির নম্বর স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।
এরপর একাধিক ক্যামেরার ফুটেজ একসঙ্গে মিলিয়ে টেম্পোটির গতিপথ অনুসরণ করা হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা। সেই সূত্র ধরে গাড়িটির অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
শেষ পর্যন্ত Swaroop Nagar-এর Khadda Colony এলাকা থেকে টেম্পোটিকে খুঁজে পায় পুলিশ। গাড়িটির চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্তকারীরা চার অভিযুক্তের কাছে পৌঁছন।
১৯ বছরের যুবক গ্রেপ্তার, তিন নাবালক হেফাজতে
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় মোট চারজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৯ বছরের Shivam Ganesh-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিনজনের বয়স ১৬ এবং ১৭ বছরের মধ্যে।
অভিযুক্তরা ঘটনার পর নিজেদের বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। রাতভর তল্লাশি চালিয়ে তাঁদের সন্ধান পাওয়া যায়।
তদন্তকারীরা প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে খতিয়ে দেখছেন। পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের দোষী বলা যাবে না।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, আরও কেউ এই ঘটনায় যুক্ত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র, পোশাক, টেম্পো এবং অন্যান্য নমুনা ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
কেন নিখোঁজের অভিযোগ হয়নি?
তদন্তে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোরীটি পরিবারের সঙ্গে থাকত না। সে কাজের সন্ধানে ছিল এবং নিজের বাবা-মায়ের থেকে আলাদা থাকত বলে তদন্তকারীদের কাছে তথ্য এসেছে।
ঘটনার পর কয়েক দিন কেটে গেলেও পরিবার থানায় নিখোঁজের অভিযোগ করেনি। পুলিশের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যরা জানতেন না যে কিশোরী বাইরে গিয়েছিল এবং নিখোঁজ হয়ে রয়েছে।
এই কারণেই দেহ উদ্ধারের পরও প্রথম দিকে মৃতার পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য এবং পরিবারের বক্তব্যের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
POCSO-সহ একাধিক ধারায় মামলা
দেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ধর্ষণ, খুন এবং প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। যেহেতু মৃতা নাবালিকা, তাই Protection of Children from Sexual Offences বা POCSO Act-এর সংশ্লিষ্ট ধারাও মামলায় যুক্ত হয়েছে।
Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, Bharatiya Nyaya Sanhita-র একাধিক ধারার পাশাপাশি POCSO Act-এর aggravated penetrative sexual assault সংক্রান্ত ধারায়ও মামলা হয়েছে। তদন্তকারীরা এখন ফরেন্সিক রিপোর্ট, CCTV ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
তদন্তে এখনও একাধিক প্রশ্ন
পুলিশের হাতে ইতিমধ্যেই চার অভিযুক্ত, টেম্পো এবং দুটি ছুরি এসেছে। কিন্তু তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। বিশেষ করে ঠিক কোথায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল, কে কীভাবে হামলায় অংশ নিয়েছিল এবং হত্যার পরে দেহ সরানোর ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
একইসঙ্গে পুলিশ খতিয়ে দেখছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে মৃতার আগের যোগাযোগ কেমন ছিল এবং তাঁকে কীভাবে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীরা প্রযুক্তিগত তথ্য এবং ফরেন্সিক রিপোর্টের সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত থাকলে তাঁদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হবে। আপাতত উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রমাণ সংরক্ষণ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
দিল্লির নিরাপত্তা নিয়ে ফের প্রশ্ন
রাজধানীর একটি জনবহুল শহুরে এলাকার কাছেই এমন ঘটনা সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই ঘটনার তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং পুলিশের তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অপরাধের সব দিক নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
CCTV ফুটেজের মাধ্যমে দ্রুত অভিযুক্তদের শনাক্ত করা গেলেও, ঘটনাটি কীভাবে ঘটল এবং আগে থেকে কোনও পরিকল্পনা ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ হলেই স্পষ্ট হবে।
এই মুহূর্তে চার অভিযুক্তই পুলিশের হেফাজতে বা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তদন্তকারীরা প্রত্যেকের বক্তব্য রেকর্ড করার পাশাপাশি ফরেন্সিক প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিশোরীর মৃত্যুর সম্পূর্ণ পরিস্থিতি এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আদালতে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটাই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



