২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিল কলকাতা পুলিশ। আগামী ২ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত মধ্য কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। এর ফলে ওই এলাকায় পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। রাজনৈতিক সভা, মিছিল, পদযাত্রা, বিক্ষোভ কিংবা ধরনা—কোনও ধরনের কর্মসূচির অনুমতি মিলবে না।
এই নির্দেশ কার্যকর হওয়ায় ধর্মতলায় তৃণমূলের ঐতিহ্যবাহী ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
মঙ্গলবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। নির্দেশ অনুযায়ী, ২ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে বউবাজার থানা, হেয়ার স্ট্রিট থানা এবং হেডকোয়ার্টার্স ট্রাফিক গার্ডের অন্তর্গত বিস্তীর্ণ এলাকা। কেসি দাস মোড় থেকে ভিক্টোরিয়া হাউস পর্যন্ত অংশ এই বিধিনিষেধের অন্তর্ভুক্ত। তবে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে।
পুলিশের ব্যাখ্যা, কলকাতার এই অংশ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ব্যস্ত এলাকা। এখানে বড় জমায়েত হলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যানজট এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে।
এই নির্দেশ কার্যকর থাকাকালীন কোনও রাজনৈতিক দল বা সংগঠন ওই এলাকায় সভা, সমাবেশ, মিছিল কিংবা পদযাত্রা আয়োজন করতে পারবে না। পাশাপাশি লাঠি, দণ্ড বা অন্য কোনও ধরনের অস্ত্র বহনের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
কলকাতার পুলিশ কমিশনার স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ এলাকায় কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদি কোনও সংগঠন অন্য কোথাও সভা করতে চায়, তবে আলাদা করে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে পুলিশ।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই বেশি, কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের প্রধান সমাবেশ ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউস সংলগ্ন এলাকাতেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিবছর ওই স্থানেই দলের সর্ববৃহৎ কর্মসূচি করেছে তৃণমূল। ফলে হঠাৎ করে সেই জায়গা হাতছাড়া হওয়া দলের সাংগঠনিক পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে। তৃণমূলের দুই শিবিরই পৃথকভাবে ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ করার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করেছিল।
আবেদন জমা দেওয়ার পর কালীঘাট তৃণমূলের নেতাদের একটি অংশকে ধর্মতলার সভাস্থল পরিমাপ করতেও দেখা যায়। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয় এবং কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের হয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কোনও পক্ষকেই ধর্মতলায় সমাবেশের অনুমতি দেয়নি কলকাতা পুলিশ। এরপরই টানা ৬০ দিনের জন্য ১৬৩ ধারা জারির ঘোষণা সামনে আসে।
ফলে এখন প্রশ্ন, ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক সমাবেশ কোথায় হবে?
দলের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কোনও ভেন্যুর ঘোষণা করা হয়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, বিকল্প হিসেবে শহরের অন্য কোনও বড় খোলা মাঠ বা সমাবেশস্থল বিবেচনা করা হতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধীরা পুলিশের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। যদিও প্রশাসনের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছে।
২১ জুলাই তৃণমূলের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। শহিদ দিবসের এই সমাবেশ শুধু দলের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ নয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকনির্দেশও সাধারণত এই সভা থেকেই ঘোষণা করা হয়।
সেই কারণেই ধর্মতলার পরিবর্তে নতুন স্থানে সমাবেশ আয়োজনের সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন নজর থাকবে, কালীঘাট তৃণমূল কবে নতুন ভেন্যুর প্রস্তাব দেয় এবং সেই আবেদন নিয়ে কলকাতা পুলিশের অবস্থান কী হয়। কারণ সময় যত এগোবে, ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতিও ততই গতি পাবে।



