সংসদ কি ফের বসতে পারে সেপ্টেম্বরেই?
আগস্টের মাঝামাঝি শেষ হয়েছে সংসদের বাদল অধিবেশন। ১৩ আগস্ট লোকসভা ও রাজ্যসভা অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি হয়। কিন্তু অন্যান্য অনেক অধিবেশনের মতো কয়েক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রোরোগেশন বা অধিবেশন সমাপ্তির বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি।
এই অস্বাভাবিক দীর্ঘ ব্যবধানই নতুন করে বিশেষ অধিবেশনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা তৈরি করেছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কেন্দ্র সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বা উৎসবের মরশুম শুরুর আগে সংসদ ফের বসানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের রিপোর্টে জানা যায়, সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রকের তরফে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আরও একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, কেন্দ্র আগামী মাসে বিশেষ অধিবেশন ডাকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে এবং এনডিএর কয়েকটি শরিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট তারিখের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সরকার আদৌ দ্রুত অধিবেশন ডেকে বিলগুলি ফের সংসদের সামনে আনে কি না।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ডিলিমিটেশন বিল?
ডিলিমিটেশন বিল, ২০২৬ লোকসভা ও বিধানসভা কেন্দ্রের সীমানা পুনর্বিন্যাসের জন্য নতুন কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে। সংসদের সরকারি নথি অনুযায়ী, বিলটির লক্ষ্য হল লোকসভায় রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির আসন বণ্টন পুনর্বিন্যাস, বিধানসভাগুলির আসনসংখ্যা পুনর্নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির পুনর্বিন্যাসের ব্যবস্থা করা।
এই প্রস্তাবটি মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার সঙ্গেও যুক্ত। এপ্রিলের বিশেষ অধিবেশনে ডিলিমিটেশন বিলের পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনী বিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা সংক্রান্ত সংশোধনী বিল আনা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের সাংবিধানিক কাঠামো কার্যকর করার পথ তৈরি করা।
ফলে ডিলিমিটেশন শুধুমাত্র আসন পুনর্বিন্যাসের প্রশাসনিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে ভবিষ্যতের লোকসভা ও বিধানসভায় প্রতিনিধিত্বের কাঠামোও জড়িয়ে রয়েছে।
এপ্রিলেই ধাক্কা খেয়েছিল কেন্দ্র
এই বিল নিয়ে সরকারের আগের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এপ্রিলের বিশেষ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনী বিল প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পায়নি। লোকসভায় ভোটাভুটিতে ৫২৮ জন সাংসদ অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৮ জন বিলের পক্ষে এবং ২৩০ জন বিপক্ষে ভোট দেন। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের সংখ্যা ছিল ৩৫২।
অর্থাৎ সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেও সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
এবার তাই বিলটি ফের সংসদে আনলে ভোটের অঙ্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শুধু সরকার পক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়।
সংবিধান সংশোধনে কত ভোট দরকার?
ভারতীয় সংবিধানের ৩৬৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদের প্রতিটি কক্ষে পাশ করাতে হলে মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
এই নিয়মই ডিলিমিটেশন-সংক্রান্ত সাংবিধানিক সংশোধনীকে সাধারণ বিলের তুলনায় আলাদা করে দিয়েছে।
ফলে সরকারকে শুধু নিজেদের জোটের সাংসদদের সমর্থন নিশ্চিত করলেই হবে না। ভোটাভুটির দিন উপস্থিত সদস্যদের হিসাব, বিরোধী সাংসদদের অবস্থান এবং কোনও দল ভোটদানে বিরত থাকে কি না—সবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এপ্রিলের ভোটের ফলাফল সেই কঠিন সংখ্যার সমীকরণই সামনে এনেছিল।
এবার শরিক ও বিরোধীদের দিকে নজর
বিশেষ অধিবেশনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই কেন্দ্র বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে একাধিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ডিএমকের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকার ডিএমকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। একইসঙ্গে কংগ্রেসও নিজেদের জোটসঙ্গীদের সঙ্গে সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে আলোচনা করছে। ফলে বিলটি সংসদে ফিরলে আঞ্চলিক দলগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে কোনও দল শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে ডিলিমিটেশনের প্রভাব নিয়ে দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে রাজনৈতিক উদ্বেগ রয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলির লোকসভা প্রতিনিধিত্ব ভবিষ্যতে কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে, সেই প্রশ্নে ইতিমধ্যেই বিতর্ক চলছে।
আসন বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায়
ডিলিমিটেশন নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল লোকসভার মোট আসনসংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারের পরিকল্পনায় বর্তমান ৫৪৩ আসনের পরিবর্তে লোকসভার মোট আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিষয়টি রয়েছে।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কাঠামোয় লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৮৫০ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোন রাজ্যে কত আসন হবে, তার চূড়ান্ত কাঠামো এখনও নির্ধারিত হয়নি।
এই সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের কারণেই বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রতিনিধিত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
দক্ষিণ বনাম উত্তর—কেন তৈরি হচ্ছে বিতর্ক?
ডিলিমিটেশনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে যে রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, তাদের তুলনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলির লোকসভা প্রতিনিধিত্বের অনুপাত কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্যের বক্তব্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নীতিতে সাফল্যের কারণে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়া উচিত নয়। কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারও লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য কী হবে এবং রাজ্যভিত্তিক আসন বণ্টনের চূড়ান্ত সূত্র কী—তা বিল ও পরবর্তী ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
এপ্রিলের ব্যর্থতার পর এবার কী কৌশল?
এপ্রিলের ভোটে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ার পর সরকারকে এবার আরও বেশি দলকে পাশে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সেই কারণেই সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য অধিবেশন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি যে সেপ্টেম্বরেই বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে। ১৫ সেপ্টেম্বরের রিপোর্টে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার কথা উঠে এলেও সরকারের তরফে কোনও চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা হয়নি।
১৭ সেপ্টেম্বরের রিপোর্টেও বিশেষ অধিবেশন নিয়ে কেন্দ্রের আগ্রহের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেটিকে এখনও প্রস্তাব বা পরিকল্পনার পর্যায়েই রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, এখনই ‘আগামী সপ্তাহে সংসদ বসছে’—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
বাদল অধিবেশন শেষের বিজ্ঞপ্তি না আসার তাৎপর্য
সংসদ অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি হওয়া এবং অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রোরোগ করা—দুটি আলাদা বিষয়। ১৩ আগস্ট দুই কক্ষ মুলতুবি হলেও অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রোরোগ না হওয়ায় সংসদীয় প্রক্রিয়া নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু আগেই জানিয়েছিলেন, অধিবেশন প্রোরোগ না হলে একই অধিবেশনের পরিসরের মধ্যে ফের বসার সাংবিধানিক সুযোগ থাকে। যদিও সেটি বাস্তবে করা হবে কি না, তা সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।
এই কারণেই নতুন করে অধিবেশন ডাকা হলে সেটিকে সম্পূর্ণ নতুন বিশেষ অধিবেশন বলা হবে, নাকি চলতি অধিবেশনেরই পুনরায় বৈঠক হিসেবে ধরা হবে—তা নিয়েও সংসদীয় পরিভাষায় পার্থক্য থাকতে পারে।
এখন নজর কোন দিকে?
এই মুহূর্তে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কেন্দ্র সংসদ বসানোর কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে কি না। দ্বিতীয়ত, ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিলগুলি কোন আকারে ফের আনা হয়। তৃতীয়ত, ভোটের আগে সরকার প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে কি না।
ডিলিমিটেশন বিল, ২০২৬ ইতিমধ্যেই লোকসভায় পেশ করা হয়েছিল এবং সংসদের সরকারি নথিতে সেটির অস্তিত্ব রয়েছে। এপ্রিলের প্রক্রিয়ায় বিলটি পাস হয়নি।
তাই সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য অধিবেশন ঘিরে মূল প্রশ্ন এখন শুধু সংসদ বসবে কি না, তা নয়। তার থেকেও বড় প্রশ্ন—ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা তৈরি হয় এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আদৌ পাওয়া যায় কি না।



