পরপর তিন দিন ধরে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রবিবার বিধানসভার সই জালিয়াতি মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। তার পরদিন প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তাঁকে জেরা করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। আর মঙ্গলবার ‘ডিজে মন্তব্য’ মামলায় হাজিরা দিতে হল রাজ্যের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির সদর দপ্তর ভবানীভবনে।
মঙ্গলবার বেলা প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ কালীঘাটের বাসভবন থেকে বেরিয়ে পড়েন অভিষেক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবীও। নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই ভবানীভবনে পৌঁছে যান তিনি। তদন্তকারীদের সঙ্গে বৈঠক ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি আগেই নেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। ভবানীভবন চত্বরের নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো। মোতায়েন করা হয়েছিল অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী। নিরাপত্তার কারণে ভবনের একাধিক অংশে প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
এই মামলার সূত্রপাত ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে অভিষেকের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরলে বিজেপি নেতাদের বাড়ির সামনে ‘ডিজে বাজানো হবে’ এবং তাঁদের ‘কান ঝালাপালা হয়ে যাবে’। রাজনৈতিক মঞ্চে করা এই মন্তব্যকে বিরোধী শিবির সরাসরি হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের ভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
এরপরই বিধাননগর সাইবার থানায় ওই মন্তব্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে এই ধরনের মন্তব্য গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর। পরে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হয়। গত সপ্তাহে তদন্তকারীরা অভিষেকের বাড়িতে গিয়ে সমন ধরিয়ে দেন। সেই সমনের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার তিনি ভবানীভবনে হাজির হন।
সূত্রের দাবি, এদিনের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আগেভাগেই একটি প্রশ্নমালা তৈরি করে রেখেছিলেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। নির্বাচনী প্রচারের সেই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট, বক্তব্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁকে একাধিক প্রশ্ন করা হতে পারে। পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করার সম্ভাবনাও ছিল।
তদন্তকারী সংস্থার একটি অংশের মতে, রাজনৈতিক সভায় দেওয়া বক্তব্য যদি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে বা কোনও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হুমকি হিসেবে প্রতিভাত হয়, তাহলে তা আইনের আওতায় পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। সেই কারণেই মামলার তদন্তে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর।
অন্যদিকে, তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক সভায় কটাক্ষ, ব্যঙ্গ বা রসিকতার ভাষা নতুন কিছু নয়। বিরোধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশ তুলে ধরে অন্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ শাসক শিবিরের।
এদিন অভিষেক ভবানীভবনে পৌঁছনোর আগেই সেখানে উপস্থিত হন মামলাকারী রাজীব সরকার। তিনি তদন্তকারীদের সঙ্গে দেখা করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। পরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁর আরও কিছু বক্তব্য রয়েছে এবং প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন।
রাজনৈতিকভাবে ঘটনাটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। কারণ, একদিকে সই জালিয়াতি মামলা, অন্যদিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলা এবং তার মাঝেই ডিজে মন্তব্য নিয়ে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ— সব মিলিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর তদন্তের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। বিরোধীরা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ শানাচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, তদন্তের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলির তৎপরতা এবং একের পর এক মামলায় অভিষেকের হাজিরা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগামী দিনে এই তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং আরও কোনও পদক্ষেপ করা হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



