বিতর্কিত রাজনৈতিক মন্তব্যের জেরে শুরু হওয়া মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটল। তাঁর কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহের জন্য সিআইডির করা আবেদন মঞ্জুর করেছে বিধাননগরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। এর ফলে তদন্তকারী সংস্থা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ভয়েস স্যাম্পল সংগ্রহ করে বিভিন্ন অডিও ও ডিজিটাল উপাদানের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাবে।
মঙ্গলবার আদালতে এই সংক্রান্ত আবেদন জানায় সিআইডি। শুনানির পর আদালত তদন্তকারী সংস্থার যুক্তি গ্রহণ করে এবং কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেয়। জানা গিয়েছে, আগামী ৩০ জুন এই প্রক্রিয়ার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের মে মাসে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে বাগুইআটিতে আয়োজিত একটি রাজনৈতিক সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে বিতর্কের জন্ম দেয়। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগকারীর দাবি ছিল, ওই মন্তব্যের মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় মামলা দায়ের করা হয়। প্রথমদিকে স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তদন্তভার গ্রহণের পর সিআইডি একাধিক দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করে। বিশেষ করে বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিও ও অডিও ক্লিপগুলির সত্যতা যাচাই, বক্তব্যের উৎস নির্ধারণ এবং ডিজিটাল উপাদানের ফরেনসিক বিশ্লেষণের উপর জোর দেওয়া হয়।
এই তদন্তের অংশ হিসেবেই ভবানী ভবনে ডেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা তাঁর বক্তব্য, প্রচারসভার পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কনটেন্ট সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন বলে সূত্রের খবর।
শুধু তাই নয়, তদন্তের স্বার্থে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তদন্তকারীরা অভিষেকের ঘনিষ্ঠ মহলের কয়েকজনের বয়ান সংগ্রহ করেছেন। বিশেষভাবে নজরে আসে তাঁর সামাজিক মাধ্যম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা।
এই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট এলাকায় একটি বাড়িতে যান, যেখানে অভিষেকের আত্মীয় এবং তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা হয়। তদন্তকারী সংস্থা জানতে চেয়েছিল বিতর্কিত ভিডিও বা বক্তব্যের প্রচার, সম্পাদনা কিংবা আপলোড সংক্রান্ত কোনও তথ্য তাঁদের কাছে রয়েছে কি না।
তদন্তকারীদের মতে, মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, যে অডিও বা ভিডিও ক্লিপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি আসল কি না এবং সেখানে শোনা কণ্ঠস্বর প্রকৃতপক্ষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কি না। সেই কারণেই কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ প্রয়োজন বলে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়েস স্যাম্পল সংগ্রহ করা হলে তা অত্যাধুনিক অডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের অডিওর সঙ্গে সংগৃহীত নমুনা মিলিয়ে দেখা হয়। কণ্ঠের স্বর, উচ্চারণ, শব্দচয়ন, ফ্রিকোয়েন্সি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি বৈজ্ঞানিক মতামত তৈরি করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও মামলায় কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও তা অভিযুক্তের দোষ প্রমাণের সমার্থক নয়। এটি কেবল তদন্তের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ফরেনসিক রিপোর্ট, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতেই আদালত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
রাজনৈতিক মহলেও এই মামলাকে ঘিরে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম আলোচিত নেতা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় টানাপোড়েন এবং একাধিক আইনি বিতর্কের মধ্যে এই মামলার অগ্রগতি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে অভিষেকের অনুগামীদের দাবি, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলুক এবং সমস্ত বিষয় তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার হোক।
এখন নজর ৩০ জুনের দিকে। সেদিন কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতে পারে। সেই রিপোর্টই পরবর্তী তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ‘ডিজে’ মন্তব্য ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন আইনি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আদালতের অনুমতির পর সিআইডির হাতে নতুন একটি তদন্ত-উপকরণ এল, যা মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



