বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হয়েছে। দলের একাংশের বিদ্রোহ এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে মতভেদের জেরে কার্যত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে ঘাসফুল শিবির। সেই সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হল নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে।
সোমবার বিকেলে নিউটাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘আসল’ তৃণমূলের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নতুন জাতীয় কর্মসমিতির ঘোষণা করা হয় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে কার্যত অস্বীকার করে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রকাশ্যে আনা হয়। ওই কমিটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে অরূপ রায়ের নাম ঘোষণা করা হয়। সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ চারজন নেতাকে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও স্থান পান ঋতব্রতপন্থী নেতারা।
ঋতব্রত শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দলের নতুন কমিটিকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে নথিভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই পালটা কৌশল নেয় কালীঘাটের নেতৃত্ব।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যা থেকেই নতুন সাংগঠনিক তালিকা চূড়ান্ত করার কাজে নেমে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাতের মধ্যেই সংশোধিত জাতীয় কর্মসমিতি এবং দলের অন্যান্য সাংগঠনিক স্তরের বিস্তারিত তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
নতুন তালিকায় চেয়ারম্যান বা চেয়ারপার্সন হিসেবে নিজের নামই বহাল রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সভানেত্রী হিসেবে রাখা হয়েছে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। যুগ্ম সম্পাদক পদে রয়েছেন ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেন। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রাখা হয়েছে শুভাশিস চক্রবর্তীর নাম।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কালীঘাট শিবির স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে, সংগঠনের বৈধ নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক উত্তরাধিকার এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে সরকারি নথি জমা দিয়ে সেই দাবিকে আইনি ভিত্তিও দিতে চাইছে তারা।
এই সংশোধিত তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও নজরে এসেছে। ৫ জুন কালীঘাটে গঠিত জাতীয় কর্মসমিতিতে অরূপ বিশ্বাসের নাম থাকলেও সর্বশেষ তালিকা থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান এবং ‘আসল’ তৃণমূলের কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।
দলের অন্দরে এই টানাপোড়েন কেবল সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন নয়, বরং তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াই বলেও মনে করা হচ্ছে। একদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের শিবির দাবি করছে যে তারাই দলের আদর্শগত ধারাবাহিকতার প্রকৃত উত্তরাধিকারী, অন্যদিকে কালীঘাট শিবির সাংগঠনিক কাঠামো ও নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতির ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই দলের নামে দুটি পৃথক শিবির নিজেদের বৈধতা দাবি করলে কমিশনকে বিভিন্ন নথি, সাংগঠনিক তথ্য এবং সমর্থনের ভিত্তি খতিয়ে দেখতে হবে। সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়াতে পারে।
তৃণমূলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট তাই এখন আর শুধুমাত্র দলীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমশ সাংবিধানিক ও আইনি মাত্রা পাচ্ছে। আগামী কয়েক দিনে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এবং উভয় শিবিরের পরবর্তী পদক্ষেপের উপরই নির্ভর করবে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়।
ফলে বাংলার রাজনীতিতে নতুন এক লড়াইয়ের সূচনা হয়ে গেল—যেখানে প্রশ্ন একটাই, তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্বের প্রতীক এবং সাংগঠনিক রাশ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে।



