চার্টার্ড বিমান ব্যবহারের খরচ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন ঘিরে তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র দাবি, তদন্তে এমন কিছু আর্থিক তথ্য সামনে এসেছে, যা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে একটি বেসরকারি বিমান পরিষেবা সংস্থার লেনদেনে বিদেশি আর্থিক কাঠামোর সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কয়েক দিন আগে এই মামলার তদন্তে কলকাতার পাঁচটি স্থানে একযোগে তল্লাশি চালায় ইডি। তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট সংস্থার অফিস এবং সংস্থার কর্ণধারদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক জায়গায় নথি ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করেন। সেই সব নথি বিশ্লেষণের পর তদন্তকারী সংস্থা একাধিক আর্থিক লেনদেন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
ইডি সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্ট এবং একটি বিমান পরিষেবা সংস্থার মধ্যে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই অর্থের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে অন্য একটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ঘুরিয়ে বিমান ও হেলিকপ্টার কেনার কাজে ব্যবহার করা হয়। এরপর সেই উড়ান পরিষেবাই আবার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ভাড়ার ভিত্তিতে পরিষেবা প্রদান করত বলে অভিযোগ।
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, এই পুরো আর্থিক প্রবাহের মধ্যে চক্রাকার বা সার্কুলার ট্রানজ্যাকশনের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ একই অর্থ একাধিক সংস্থার মাধ্যমে ঘুরিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
এই ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে তথাকথিত ‘কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ’ সংযোগের অভিযোগ। ইডির দাবি, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ২০২৩ সালে কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত একটি শেল কোম্পানির কাছ থেকে ১৭ লক্ষ মার্কিন ডলারের ঋণ নেওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছিল। তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন বিচারিক প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
ইডির দাবি অনুযায়ী, কেম্যান দ্বীপপুঞ্জকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি পরিচিত ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ওই অঞ্চলের সংস্থার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়েও তদন্ত চলছে। সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং বিদেশি আর্থিক যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। কুণাল ঘোষ বলেন, তদন্তকারী সংস্থার প্রকাশ করা তথ্য সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য, যদি ইডির অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও অনিয়মের প্রমাণ মেলে, তাহলে বিষয়টির শেষ পর্যন্ত তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে আসা দরকার।
তিনি আরও জানান, অভিযোগ সত্য হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কোনও ধরনের আর্থিক অনিয়ম থাকলে তা প্রকাশ্যে এনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্তের দাবি আরও জোরালো করেছে। তাঁদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের উৎস, অর্থের ব্যবহার এবং বিদেশি সংযোগ— সব বিষয়েই স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদেশে নিবন্ধিত কোনও সংস্থার সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক থাকলে তার বৈধতা খতিয়ে দেখা উচিত বলে তাঁদের মত।
তদন্তের অংশ হিসেবে রাধাবাজার এলাকায় অবস্থিত সংশ্লিষ্ট সংস্থার অফিস এবং সংস্থার দুই ডিরেক্টরের সঙ্গে যুক্ত একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন নথি, আর্থিক রেকর্ড এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করেছে ইডি। তদন্তকারীরা এখন সেই নথিগুলি বিশ্লেষণ করছেন।
ইডি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, সংগৃহীত নথির ভিত্তিতে আর্থিক লেনদেনের সম্পূর্ণ চিত্র পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে আরও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে। বিদেশি আর্থিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
তবে এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ এখনও বিচারাধীন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাকে দোষী বলা যায় না। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য সামনে এলে সেই অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে।
রাজনৈতিক মহলের নজর এখন এই তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে। ইডি ভবিষ্যতে আরও কী তথ্য আদালতে পেশ করে এবং তদন্তে নতুন কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।



