ব্রিকস মঞ্চে জিনপিংকে ঘিরে কী হয়েছিল?
২০২৬ সালের ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনের প্রথম দিনের অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতা। চিনের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, জিনপিং ওই অধিবেশনে বক্তব্যও রাখেন।
এই সময় জিনপিংকে ঘিরে একটি মুহূর্তের ভিডিও ও বিভিন্ন দাবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তার ভিত্তিতেই তাঁর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
এরপর আরও জল্পনা তৈরি হয় যখন জিনপিং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া ব্রিকসের সরকারি নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁর নৈশভোজে না থাকার কারণ হিসেবে তখন কোনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত স্বাস্থ্যগত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
চিনা বিরোধী নেতার বিস্ফোরক দাবি
জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত করেন চিনা বিরোধী নেতা ওয়ানজুন শিয়ে। চিনা ডেমোক্রেসি পার্টির এই নেতার দাবি, ব্রিকস সম্মেলনের সময় জিনপিং হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর গুরুতর ইস্কেমিক স্ট্রোক হয়েছিল।
শিয়ের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট অনুযায়ী, দিল্লিতে জিনপিংকে তাঁর সঙ্গে থাকা চিকিৎসকরা জরুরি চিকিৎসা দেন। এরপর বিশেষ বিমানে তাঁকে চিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।
আরও দাবি করা হয়েছে, বেজিং বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর জিনপিংকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ৩০১ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে চিকিৎসা করা হয়।
তবে এই পুরো বিবরণই এখনও ওয়ানজুন শিয়ের দাবি। কোনও সরকারি বিবৃতি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এই বক্তব্যকে সমর্থন করেনি। তাঁর পোস্টে পরে X-এর কমিউনিটি নোটও যুক্ত হয়েছে, যেখানে দাবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সরকারি নথিতে কী পাওয়া যাচ্ছে?
জিনপিংয়ের অসুস্থতার দাবির সঙ্গে চিনের সরকারি তথ্যের কিছুটা অমিল রয়েছে। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন জিনপিং।
সেই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। একই দিনে ব্রিকসের প্রথম অধিবেশনেও তিনি অংশ নেন এবং বক্তব্য রাখেন।
অন্যদিকে, প্রকাশিত সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি দিল্লি থেকে রওনা দেন। এই যাত্রাকে নির্ধারিত সফরসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ‘জরুরি ভিত্তিতে অসুস্থ হয়ে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরানো হয়েছিল’—এই দাবির পক্ষে এখনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
‘স্ট্রোক’ দাবির পক্ষে এখনও নেই স্বাধীন প্রমাণ
জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা নতুন নয়। চিনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য সাধারণত খুব সীমিতভাবে প্রকাশ্যে আসে। ফলে কোনও দৃশ্যমান অস্বস্তি বা কর্মসূচি বাতিলের ঘটনা সামনে এলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই ক্ষেত্রেও একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকেই মূল দাবিটি ছড়িয়েছে। এখনও পর্যন্ত চিন বা ভারতের কোনও সরকারি সংস্থা জিনপিংয়ের স্ট্রোক, অজ্ঞান হয়ে পড়া কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ফলে জিনপিংয়ের সত্যিই স্ট্রোক হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য এই মুহূর্তে নেই। বরং বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এটিকে অযাচাইকৃত দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ব্রিকসের পর অসুস্থ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট রামাফোসা
জিনপিংকে ঘিরে অপ্রমাণিত দাবির পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া আর এক রাষ্ট্রনেতার অসুস্থ হওয়ার খবর অবশ্য সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন। তার পরদিন, ১৬ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্সি জানায়, অসুস্থতার কারণে তিনি সাময়িকভাবে সরকারি কর্মসূচি থেকে বিরতি নিচ্ছেন।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রামাফোসাকে তাঁর চিকিৎসকরা বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তাঁর অসুস্থতার প্রকৃতি বা গুরুতরতার বিষয়ে কোনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অর্থাৎ রামাফোসার অসুস্থতার বিষয়টি সরকারি ভাবে স্বীকৃত হলেও জিনপিংয়ের ক্ষেত্রে এখনও সেই ধরনের নিশ্চিত তথ্য নেই।
একই সময়ে দুই নেতাকে ঘিরে কেন এত আলোচনা?
ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনেতা উপস্থিত ছিলেন। ভারত, চিন, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা-সহ সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে এই সম্মেলন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে।
সেই সম্মেলনের পর একদিকে জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে অপ্রমাণিত দাবি এবং অন্যদিকে রামাফোসার অসুস্থতার সরকারি খবর সামনে আসায় সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই ঘটনাকে একসঙ্গে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু দুটি ঘটনার তথ্যের ভিত্তি এক নয়। রামাফোসার ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্সি নিজেই অসুস্থতার কথা জানিয়েছে। জিনপিংয়ের ক্ষেত্রে এখনও কোনও সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই। তাই দুই ঘটনাকে একই মাত্রায় দেখা ঠিক হবে না।
ব্রিকস সফর নিয়ে চিনের সরকারি বিবরণ
চিনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বর জিনপিং নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন। একই দিনে তিনি মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেন।
চিনের বিদেশ মন্ত্রকের বিবরণে ওই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশকে অংশীদার হিসেবে দেখার কথা বলেন জিনপিং এবং সীমান্ত পরিস্থিতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির উপর জোর দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি ব্রিকসের প্রথম অধিবেশনেও তাঁর উপস্থিতি এবং বক্তব্যের সরকারি রেকর্ড রয়েছে। ফলে সম্মেলনের সময় তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনও গুরুতর সমস্যা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখন যে আলোচনা চলছে, তার উত্তর সরকারি ভাবে এখনও পাওয়া যায়নি।
এখন নজর চিনের সরকারি বক্তব্যের দিকে
জিনপিংয়ের ‘স্ট্রোক’ সংক্রান্ত দাবিটি সত্যি না গুজব—তা নিশ্চিত করার জন্য চিনা সরকারের কোনও বিবৃতি বা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন।
এই মুহূর্তে যে তথ্যগুলি যাচাই করা যাচ্ছে, তাতে বলা যায়—জিনপিং ব্রিকস সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সম্মেলনের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতর অসুস্থতার দাবি এসেছে চিনা বিরোধী নেতার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে, কিন্তু তার স্বাধীন প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে রামাফোসার অসুস্থতা সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়েছে, যদিও তাঁর অসুস্থতার বিস্তারিত কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
তাই আপাতত জিনপিংয়ের স্ট্রোকের খবরকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে নয়, অযাচাইকৃত দাবি ও জল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে চিনা কর্তৃপক্ষের কোনও বিবৃতি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।



