ব্রিকসের টেবিলে ভারতীয় রন্ধনশৈলীর প্রদর্শন
রাজধানীতে ব্রিকস সম্মেলনের প্রথম দিনেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নজর কেড়েছে মধ্যাহ্নভোজের মেনু। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান এবং শীর্ষ পর্যায়ের অতিথিদের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিচিত নিরামিষ পদ দিয়ে সাজানো হয়েছিল লাঞ্চের মূল অংশ।
ভারতীয় রান্নার বৈচিত্র্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে খাবারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাদ ও রান্নার ধরনকে একই টেবিলে হাজির করার চেষ্টা ছিল মেনু নির্বাচনে।
মেনুতে যেমন ছিল উত্তর ভারতের পরিচিত পদ, তেমনই ছিল চাল, ডাল, সবজি এবং মশলার সমন্বয়ে তৈরি একাধিক ঐতিহ্যবাহী খাবার। ফলে ব্রিকসের বৈঠকের বাইরে অতিথিদের সামনে ভারতের আরেকটি পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
মূল মেনুতে পনির থেকে দম আলু
প্রথম দিনের মধ্যাহ্নভোজের মূল আকর্ষণ ছিল একাধিক নিরামিষ ভারতীয় পদ। মেন কোর্সে রাখা হয়েছিল পনির লাবাবদার, রাজমা রাসিলা, ডাল পঞ্চমেল, সব্জ মতিয়া পোলাও, মকই লসুনি পালক এবং দম আলু বানারসি।
পনির লাবাবদার উত্তর ভারতীয় রান্নার অন্যতম পরিচিত পদ। অন্যদিকে রাজমা রাসিলা ও ডাল পঞ্চমেলের মতো খাবারে ভারতীয় ডাল এবং মশলার ব্যবহার স্পষ্ট। পোলাও এবং দম আলু আবার ভারতের ঐতিহ্যবাহী রান্নার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
মেনুতে এমন পদ রাখার ফলে বিদেশি অতিথিদের সামনে ভারতীয় নিরামিষ রান্নার বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। সাধারণ সবজি বা ডালের রান্নাকে কীভাবে নানা মশলা ও প্রস্তুতিপদ্ধতির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা যায়, সেই বৈচিত্র্যও এই মেনুতে ধরা পড়েছে।
এক টেবিলে উত্তর ভারতের নানা স্বাদ
ব্রিকস লাঞ্চের ভারতীয় মেনুতে উত্তর ভারতের রান্নার প্রভাব বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। পনির, রাজমা, ডাল এবং আলুর মতো পরিচিত উপকরণ দিয়েই তৈরি করা হয়েছে একাধিক পদ।
দম আলু বানারসি নামেই বোঝা যায় উত্তর ভারতের একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক রান্নার ছোঁয়া রয়েছে এতে। একইভাবে রাজমা ও ডালের পদও ভারতীয় ঘরোয়া রান্নার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিদেশি অতিথিদের সামনে এই ধরনের পদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ভারত তার দৈনন্দিন ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সংস্কৃতিকেও তুলে ধরেছে। অর্থাৎ শুধু বিলাসবহুল বা অচেনা খাবার নয়, ভারতীয় রন্ধনশৈলীর পরিচিত স্বাদকেও আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে জায়গা দেওয়া হয়েছে।
দেশীয় মেনুর পাশে আন্তর্জাতিক রান্না
তবে পুরো মেনুই যে ভারতীয় ছিল, তা নয়। বিদেশি অতিথিদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যাভ্যাসের কথা মাথায় রেখে রাখা হয়েছিল কয়েকটি ইউরোপীয় পদও।
মেনুতে ছিল ইতালির ‘পেনে অল পোমোদোরো এ পান্না’। পাশাপাশি সাইট্রাস পার্সলে ড্রেসিংয়ে ম্যারিনেট করা পার্ল মিলেট, ফরাসি কায়দায় তৈরি বেকড ভেজ ও গ্র্যাঁতা এবং হারিকোট বিন্স ও চার্ড পেপারের সালাডও রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ মেনু পরিকল্পনায় দুটি দিককে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একদিকে ভারতের নিজস্ব রন্ধন ঐতিহ্য, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অতিথিদের পরিচিত স্বাদের খাবার।
ভারতীয় শস্যেও নজর
এই মেনুর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পার্ল মিলেটের ব্যবহার। ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরনের মিলেটের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও মিলেট নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে।
সাইট্রাস পার্সলে ড্রেসিংয়ের সঙ্গে পার্ল মিলেট পরিবেশন করে ভারতীয় শস্যকে একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক খাবারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী উপকরণ এবং আধুনিক পরিবেশনের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি হয়েছে।
এভাবে ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের খাবারের তালিকায় ভারতীয় উপকরণকে জায়গা দেওয়াও দেশের খাদ্যসংস্কৃতিকে তুলে ধরার একটি উপায় হয়ে উঠেছে।
নিরামিষ মেনু কেন নজর কাড়ল?
প্রথম দিনের লাঞ্চ সম্পূর্ণ নিরামিষ হওয়ায় মেনুটি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতির দেশে আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য নিরামিষ মেনু তৈরি করা সহজ বিষয় নয়।
কারণ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরামিষ রান্নার ধরনও একে অপরের থেকে যথেষ্ট আলাদা। কোথাও ডাল ও সবজির উপর গুরুত্ব, কোথাও পনির ও দুগ্ধজাত খাবারের ব্যবহার, আবার কোথাও বিভিন্ন ধরনের চাল ও শস্যের পদ—সব মিলিয়ে ভারতীয় নিরামিষ রান্নার পরিসর বিশাল।
ব্রিকসের মধ্যাহ্নভোজে সেই বৈচিত্র্যেরই একটি নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হয়েছে।
খাবারের টেবিলেও সাংস্কৃতিক বার্তা
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে খাবার অনেক সময় কূটনীতির অনানুষ্ঠানিক অংশ হয়ে ওঠে। আলোচনার টেবিলের বাইরে একটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাত্রাকে তুলে ধরার সহজ মাধ্যম হতে পারে খাবার।
ব্রিকসের লাঞ্চে ভারতীয় পদগুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেও সেই সাংস্কৃতিক বার্তা রয়েছে। বিদেশি অতিথিরা যাতে ভারতীয় রান্নার বিভিন্ন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই মেনুতে একাধিক দেশীয় পদ রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পদ রাখার মাধ্যমে অতিথিদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসের প্রতিও নজর দেওয়া হয়েছে।
পুজোর আমিষ বিতর্কের আবহে নিরামিষ মেনু
এই মেনু সামনে আসার সময় ভারতে খাবার নিয়ে একটি আলাদা বিতর্কও চলছে। বিশেষ করে পুজোর সময়ে আমিষ খাবার খাওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সেই আবহে ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রথম দিনের মধ্যাহ্নভোজ সম্পূর্ণ নিরামিষ হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সম্মেলনের মেনু এবং দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যসংক্রান্ত বিতর্ক—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার কোনও প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিক অতিথিদের খাদ্যাভ্যাস, অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং মেনু পরিকল্পনার নিজস্ব বিবেচনাতেই খাবার নির্বাচন করা হয়ে থাকে।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের ‘ফুড ডিপ্লোমেসি’
ভারতের রন্ধনশৈলী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়। তবে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেশের আঞ্চলিক রান্নাকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হলে তার আলাদা তাৎপর্য তৈরি হয়।
ব্রিকসের মধ্যাহ্নভোজে পনির, রাজমা, ডাল, পোলাও এবং দম আলুর মতো পদ জায়গা পাওয়ায় ভারতীয় খাবারের বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে ইতালীয় ও ফরাসি রান্নার সংযোজন দেখিয়েছে, আয়োজনে ভারতীয় পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক স্বাচ্ছন্দ্য—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা হয়েছিল।
মেনুতে বৈচিত্র্য, আয়োজনে বার্তা
ব্রিকস সম্মেলনের প্রথম দিনের মধ্যাহ্নভোজ তাই শুধু খাওয়াদাওয়ার আয়োজন ছিল না। মেনুর প্রতিটি অংশের মধ্যেই ভারতের খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরার চেষ্টা ছিল।
দেশীয় মশলা ও উপকরণে তৈরি ভারতীয় পদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রান্না—সবকিছুকে একই মেনুতে জায়গা দেওয়া হয়েছে। বিদেশি অতিথিদের স্বাদ ও পছন্দের কথা মাথায় রাখার পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব রন্ধন ঐতিহ্যকেও সামনে রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ব্রিকসের প্রথম দিনের মধ্যাহ্নভোজে কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে ভারতের আরেকটি শক্তিশালী পরিচয় উঠে এল—তার বহুবর্ণের খাদ্যসংস্কৃতি। বিশ্বনেতাদের পাতে পনির লাবাবদার থেকে দম আলু বানারসি, আর তার পাশেই ইতালীয় পেনে ও ফরাসি পদ—মেনুতেই যেন মিলল ভারতীয় ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক রুচির মেলবন্ধন।



