রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের আবহে বিধানসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি গঠিত বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য তালিকা প্রকাশ্যে আসতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, সেখানে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের কোনও প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। বরং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের একাধিক বিধায়ক এবং নেতা এই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন।
গত ১৯ জুন নতুন করে এই কমিটির পুনর্গঠন করা হয়। বিধানসভার কার্যপ্রণালী নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই কমিটি। অধিবেশনের সময়সূচি, আলোচ্য বিষয়, বিল পেশের দিনক্ষণ, বিতর্কের সময়সীমা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের রূপরেখা এখানেই নির্ধারিত হয়। ফলে এই কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব থাকা মানেই বিধানসভার কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ।
নতুন তালিকায় বিজেপির একাধিক বিধায়কের পাশাপাশি জায়গা পেয়েছেন ঋতব্রতপন্থী মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান, বিধায়ক বিপ্লব মিত্র এবং সমীর কুমার জানা। এছাড়া আমন্ত্রিত সদস্যদের তালিকাতেও রয়েছে ঋতব্রত শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ মুখ সন্দীপন সাহা ও জাভেদ আহমেদ খানের নাম। অন্যদিকে, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং আইএসএফের মতো দলগুলিরও প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এই কমিটিতে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে বিধানসভার স্পিকার এখনও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকেই তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যকর প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করছেন। সেই কারণেই বিএ কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে কালীঘাটপন্থীদের কোনও স্থান দেওয়া হয়নি।
বর্তমান কমিটির স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক, দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, তাপস রায়, শঙ্কর ঘোষ, জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, স্বপন দাশগুপ্ত, শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, মালতি রাভা রায়, বিশাল লামা, উমেশ রাই, অনুপম বিশ্বাস ও বিরাজ বিশ্বাস। বিরোধী দলনেতা হিসেবে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সরকারি মুখ্য সচেতক হিসেবে আছেন অম্লান ভাদুড়ি। বিরোধী মুখ্য সচেতকের দায়িত্বে রয়েছেন আখরুজ্জামান।
এছাড়াও আমন্ত্রিত সদস্যদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী, কংগ্রেসের মোহতাব শেখ, সিপিএমের মোস্তাফিজুর রহমান এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর। ফলে কার্যত সব রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও কালীঘাট তৃণমূলের অনুপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি কমিটিতে সদস্য না থাকার বিষয় নয়। বরং এটি বিধানসভার ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রতিফলন। গত কয়েক মাসে একের পর এক সাংগঠনিক ও পরিষদীয় ধাক্কার মুখে পড়েছে কালীঘাটপন্থী শিবির। প্রথমে বিরোধী দলনেতার পদ হাতছাড়া হয়, পরে মুখ্য সচেতকের দায়িত্বও চলে যায়। এখন বিএ কমিটি থেকেও বাদ পড়ায় আইনসভার কার্যক্রমে তাদের প্রভাব আরও সীমিত হয়ে গেল।
একসময় রাজ্যের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিধানসভার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নেপথ্যে থাকত কালীঘাটের নির্দেশ। গত দেড় দশক ধরে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি এবং বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কার্যত পুরো পরিষদীয় কৌশল নির্ধারিত হত সেই কেন্দ্র থেকেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ছবিতে বড়সড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির ইতিমধ্যেই বিধানসভায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বিরোধী শিবিরের ভিতরে সংখ্যাগত শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন কমিটি এবং পরিষদীয় কাঠামোয় তাদের উপস্থিতিও ক্রমশ বাড়ছে। বিএ কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব পাওয়াকে সেই প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে কালীঘাট শিবিরের অনুগামীরা মনে করছেন, বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। কারণ বিধানসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্বের অভাব ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন ও বিতর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে নির্বাচন কমিশনে দলীয় স্বীকৃতি ও প্রতীকের লড়াইয়ের পাশাপাশি বিধানসভার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রশ্নও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ আইনসভার কমিটিগুলিতে কারা প্রতিনিধিত্ব করবে, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটির তালিকা প্রকাশের পর স্পষ্ট যে বিধানসভার অভ্যন্তরে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির ক্রমশ নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ফলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন শুধু দলীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রভাব পড়ছে রাজ্যের আইনসভার গুরুত্বপূর্ণ স্তরেও।
বিধানসভার নতুন বিএ কমিটি:
নিশীথ প্রামাণিক
দিলীপ ঘোষ
অগ্নিমিত্রা পাল
দীপক বর্মন
তাপস রায়
শঙ্কর ঘোষ
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
স্বপন দাশগুপ্ত
শারদ্বত মুখোপাধ্যায়
মালতি রাভা রায়
বিশাল লামা
উমেশ রাই
অনুপম বিশ্বাস
বিরাজ বিশ্বাস
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (বিরোধী দলনেতা)
অম্লান ভাদুড়ি (সরকারি মুখ্য সচেতক বা চিফ হুইপ)
আখরুজ্জামান (বিরোধী চিফ হুইপ বা মুখ্য সচেতক)
বিপ্লব মিত্র (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পন্থী)
সমীর কুমার জানা (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পন্থী)
আমন্ত্রিত সদস্য:
হুমায়ূন কবীর (আমজনতা উন্নয়ন পার্টি)
নওশাদ সিদ্দিকী (আইএসএফ)
মোহতাব শেখ (কংগ্রেস)
মহম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান (সিপিআইএম)
বঙ্কিম চন্দ্র ঘোষ (বিজেপি)
পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায় (বিজেপি)
সুদীপ কুমার মুখার্জি (বিজেপি)
অরুণ হালদার (বিজেপি)
সন্দীপন সাহা (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পন্থী)
জাভেদ আহমেদ খান (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পন্থী)



